পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের নেপথ্যে ডিসেম্বরকে টার্গেট করে প্রস্তুতি

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চার দিন ধরে রাজপথে পোশাকশ্রমিকরা। এর নেপথ্যে সামনে আসছে আগামী ডিসেম্বরে বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতির বিষয়টি। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিক দাবিকে হাতিয়ার করে শিল্পাঞ্চল অশান্ত করার চেষ্টা চলছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক সংকটের কথা বলে অনেক প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রেখেছে। একই সময়ে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসবের পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ‘সম্মানজনকভাবে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিস্থিতি’ তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ চালাচ্ছেন তারা। এমনকি বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পোশাকশ্রমিকদের এবারের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় আশুলিয়া থেকে। গত শনিবার সকাল ৮টার পর কাঠগড়া, আমতলা ও নয়াপাড়া এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়। প্রথমে নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তারা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন।
এক পর্যায়ে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনের মতো এসব এলাকায় রাস্তায় নামে শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক স্থানে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। মিরপুরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করেছে শিল্প পুলিশ।
গাজীপুরে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভোগড়া, নাওজোড়, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অচল হয়ে পড়ে।
মজুরি বোর্ড গঠন হলেও আন্দোলন থামেনি। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হচ্ছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে গত সোমবার পর্যন্ত ৭০০ কারখানা বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার নতুন করে আরও ৬২টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফিরবেন বলে তারা আশা করছেন। তবে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে সেটিকে ভিন্ন উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২০১৩ সালে ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা। ২০১৮ সালে তা ৮ হাজার টাকা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিক্ষোভের মুখে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এই মজুরি কার্যকর হয় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
বেতন বন্ধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০ হাজার ২১৫টি। এর মধ্যে গাজীপুর ও আশুলিয়ার ১০০টি প্রতিষ্ঠানে কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। অর্ডার ও কাজ চলমান থাকার পরও এসব প্রতিষ্ঠান বেতন দিচ্ছে না। তাদের দাবি, দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ না থাকা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ব্যবসা ভালো না চলায় প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে ভুগছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া শ্রমিকেরা এমনিতেই বিক্ষুব্ধ। এরপর বেতন বৃদ্ধির দাবিতে তারা মাঠে নেমেছেন।
আশুলিয়ার বসুন্ধরা গার্মেন্টসে গত মে মাস থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ। আশুলিয়ার সংগু টেক্স জুলাই থেকে তাদের ১ হাজার ৬০০ শ্রমিকের বেতন বন্ধ রেখেছে। ইনজেনিটেক্স, জেড এস এন্টারপ্রাইজ ও লামিয়া সোয়েটার আগস্ট মাস থেকে বেতন বন্ধ করেছে। ইসলাম এক্সেসরিজ জুলাই মাস থেকে বেতন দিচ্ছে না।
কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেয়া কম্পোজিট জুলাই মাস থেকে বেতন বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়া শিলা হামিম, এসএম ফ্যাশন, হিলস্টন ফ্যাশন, স্টাইল ফ্যাশন, নাফ ফ্যাশন, বাধন গার্মেন্টস ও এমআর সোয়েটারে গত জুলাই ও আগস্ট মাস থেকে বেতন বন্ধ।
দীর্ঘদিন বেতন বন্ধ থাকায় বিক্ষুব্ধ অবস্থায় রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন এমন চারজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বেতন না পেয়ে বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নামতে হয়েছে।
নজরদারিতে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের নেতারা
গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী লিপি আক্তার গত ২০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নিউ এজ অ্যাপারেলসে যান। সেখানে বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন তিনি। এসব বৈঠকে লিপি বলেন, ‘সরকার নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে। যারা সরকারি বাথরুম পরিষ্কার করবে, পিয়ন তাদের বেতন দেবে ৩০ হাজার টাকা। আর আমরা ১৫ হাজারও পাই না। আমরা রেমিট্যান্স আনি দেশ চালাই। আমাদের টাকা দিয়া সরকারি বেতন বাড়াইছে। এবার সব জিনিসের দাম বাড়বে। আর আমরা না খেয়ে থাকব। আমরাও ৩০ হাজার টাকা বেতন চাই। না হলে যখন বলব কাজ বন্ধ করে দিবা। আমরা রাস্তায় না নামলে কোন সরকার আমাদের বেতন বাড়ায়নি।’
বৈঠকে লিপি আক্তারের বক্তব্য শুনেছেন এমন দুজন পুলিশকে জানিয়েছেন, লিপি আক্তার, রাসেল ও আলামিন নামের কয়েকজন প্রায়ই এই এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টসে যান। তারা শ্রমিকদের বোঝান যে, রাস্তায় না নামলে বেতন বাড়বে না। কোনোদিন বাড়েনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, লিপি আক্তারসহ কয়েকজন শ্রমিক নেতা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে বিক্ষুব্ধ করে তুলে রাস্তায় নামিয়েছেন। লিপি আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন। নিজে থেকেই শ্রমিকরা তাদের বাঁচার জন্য আন্দোলন করছে।’ বিভিন্ন গার্মেন্টসে গিয়ে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।
স্বাধীন বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি আল কামরান একসময় জাতীয় পার্টির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক পার্টির জেলা সভাপতি ছিলেন। ২০২০ সালের পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগে সক্রিয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কিছুদিন চুপ থাকলেও নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছেন তিনি।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, প্রতিদিন আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে সাভারে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আল কামরান। কোনো কারখানা কাজ করতে চাইলে লোক দিয়ে সেখানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের বের করে আন্দোলনে নামানোর চেষ্টা করেন তিনি। তার মতো এমন বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আশুলিয়া এলাকা অশান্ত করে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন শিল্পমালিকের সঙ্গে যোগসাজসে এই আন্দোলনে ব্যাপকভাবে তৎপরতা চালিয়েছেন কিছু শ্রমিকনেতা।
নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার মো. ওহাব খানের ছেলে মো. আজিজুল খান এবং ঘোষবাগ এলাকার মৃত আশেক আলী মোল্লার মেয়ে আসমা আক্তার। আরও আছেন নিশ্চিন্তপুর এলাকার আইয়ুব আলীর মেয়ে লিপি আক্তার, একই এলাকার রাসেল এবং সিরাজ গ্রামের মো. আব্দুল কালামের ছেলে মো. আল আমিন। তালিকায় কুষ্টিয়ার ঈশানপুর এলাকার মো. আব্দুল রহিমের মেয়ে মোছা. সেলিনা খাতুনও আছেন। কেয়া গ্রুপের শ্রমিক আসমা আক্তার আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয়। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গার্মেন্টসে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের আড়ালে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘সাধারণ শ্রমিকরা কাজে থাকতে চান। কিন্তু বহিরাগত কিছু লোকের ইন্ধনে একটি পক্ষ প্রতিদিন সকালে কাজে যোগ দিতে আসা শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কারখানা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। তারা আমাদের নজরদারিতে আছে। তবে শ্রমিকদের মানসিকতা বুঝে সবকিছু সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ তৎপর রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকেরা যাতে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সেজন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।’
গাজীপুরে আরও অন্তত পাঁচজন শ্রমিক নেতা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের একজন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম। এ ছাড়া সক্রিয় আছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, গণতান্ত্রিক গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর জেলা সভাপতি আসাদুল ইসলাম মাসুদ এবং সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আনিসুর রহমান।
source: Asia Post







