ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যালট ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায়

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে কথিত অনাগরিক ভোটারদের ব্যালট আলাদা করে রাখা এবং গণনা না করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর আগে নিম্ন আদালতগুলোও ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে।
দ্য গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার (২ নভেম্বর) এ রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা। জরুরি ভিত্তিতে আদালতে আসা মামলার ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট এ রায়ের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বিচারপতিদের মধ্যে কারও ভিন্নমত বা আপত্তির কথাও জানানো হয়নি।
ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটার তালিকায় ২০ হাজার অনাগরিকের নাম রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) এমন দাবিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে অঙ্গরাজ্যটির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি বিরোধ চলছিল।
গত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে লস অ্যাঞ্জেলেস ও স্যাক্রামেন্টোর নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে একটি ইউএসবি ড্রাইভে এসব ব্যক্তির নাম পাঠায় বিচার বিভাগ। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের ব্যালট আলাদা করে সংরক্ষণ এবং গণনা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ জন্য কর্মকর্তাদের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশ না মানলে মামলা করারও হুমকি দিয়েছিল বিচার বিভাগ। তবে নির্বাচন কর্মকর্তারা সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের এ অবস্থানের পরই বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং শুরু হয় একের পর এক আইনি লড়াই।
তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
বিচার বিভাগের দাবির পরপরই ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা ও ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এর প্রতিবাদ জানায়। তাদের প্রশ্ন ছিল, কীভাবে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং এর তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য। তাদের অভিযোগ, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করতেই ট্রাম্প প্রশাসন এমন উদ্যোগ নিয়েছে।
বিচার বিভাগ তালিকা তৈরির পদ্ধতি কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যালোচনায় তালিকাটিতে একাধিক ভুল ও অসঙ্গতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির ক্লার্ক ও রেকর্ডার ডিন লোগান তালিকা পাওয়ার পর এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিচার বিভাগ তাদের নথিতে যাদের নাম রয়েছে, তাদের ভোট দেওয়ার অযোগ্য বলে দাবি করার পক্ষে কোনো মূল প্রমাণ, তথ্যের উৎস কিংবা পদ্ধতি সরবরাহ করেনি।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও বিচার বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিম্ন আদালতগুলোতে বারবার হারের পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের বিচার বিভাগের ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন আক্রমণকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি।’
অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা বলেন, প্রশাসনের জরুরি আদালতি আদেশের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন ব্যাহত করার প্রচেষ্টা এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বন্ধ হওয়া উচিত। তবে তাদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ভোট গণনা করলে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার হুমকিও দিয়েছিল বিচার বিভাগ। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। গত শুক্রবার এক ফেডারেল বিচারক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন হুমকি দেওয়া থেকে সরকারকে বিরত রাখার নির্দেশ দেন।
এদিকে কথিত অনাগরিক ভোটারদের তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার এমন কয়েক ডজন অনাগরিককে গ্রেপ্তারের ঘটনাও প্রচার করে, যাদের বিরুদ্ধে ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব গ্রেপ্তারের সময় সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল। পরে গ্রেপ্তারের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজন কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করছেন। তাদের দাবি, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অযোগ্য— এমন কোনো তথ্য তাদের জানা ছিল না। তাদের একজন ওমর মুনোজ গত মাসে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘পুরো ঘটনাটিই সাজানো হয়েছিল এবং আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তারা একটি দৃশ্য তৈরি করতে চেয়েছিল।’
আদালতে একের পর এক ধাক্কা
ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হয়েছে। অনাগরিকদের অবৈধ ভোট গণনা করা হলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকির পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যটিতে কথিত অনাগরিক ভোট নিয়ে ফৌজদারি তদন্তও শুরু করেছে প্রশাসন। এ ছাড়া নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন নথি ও তথ্য চেয়ে সমন পাঠানো শুরু হয়েছে।
এর আগে গত ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক ডেভিড কার্টার ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যালট আলাদা রাখার আবেদন নাকচ করে দেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মনোনীত এই বিচারক তার রায়ে বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারকে নিজেদের সাংবিধানিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করতে বাধ্য করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও চরম পদক্ষেপ।
রায়ে কার্টার লিখেছিলেন, ‘আমেরিকার ইতিহাসে এর আগে কখনো কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনের ঠিক আগে কোনো অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারকে তাদের নিজস্ব সাংবিধানিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া পরিত্যাগ করে নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেনি।’
এরপর গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালতও ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন। সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রশাসনের আইনি অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিলো।
নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা
ক্যালিফোর্নিয়াকে ঘিরে এই বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ সামনে এনে নির্বাচনে জালিয়াতির দাবি করে আসছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যেও কথিত অনাগরিকদের ব্যালট আলাদা করে রাখার দাবি জানিয়েছে বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় ২৮ জন গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন এবং অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ভোট জালিয়াতির অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার বা দোষী সাব্যস্ত করা গেলে তথ্যদাতাকে ১০ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়ার অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে বিভিন্ন গবেষণার তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার অযোগ্য অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অনাগরিক ভোটারদের উপস্থিতির অভিযোগ তুলে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের চেষ্টা এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
source: Rajneete







