News

পুলিশের ৬৪ শতাংশ গাড়িই ১০ বছরের পুরোনো, ৬৩৯ থানায় চরম যানবাহন সংকট

নিয়মিত টহল, অপরাধ দমন এবং জরুরি সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সেবা দিচ্ছে পুলিশ। কিন্তু নানা কারণে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। ট্রাফিক, অপরাধ তদন্ত ও টহল সক্ষমতা বজায় রাখার মূল চালিকাশক্তি হলো যানবাহন। অথচ তাদের বেশির ভাগ যানবাহনের ৬৪ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের অধিক। অনেক যানবাহন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত এবং জরুরি সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক নথিতে উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ে পুলিশের যানবাহনের এ তীব্র সংকটের চিত্র।

বর্তমানে দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় মোট যানবাহনের রয়েছে এক হাজার ২৩৭টি। এরমধ্যে ৬৪ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের বেশি। একদিকে অপর্যাপ্ত সংখ্যা, অন্যদিকে পুরোনো যানবাহনের বারংবার মেকানিক্যাল বিকলতার কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সাড়াদান ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

থানাপর্যায়ে গড়ে দুইটিরও কম গাড়ি

নথি তথ্যানুযায়ী, দেশে জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা রয়েছে। এ ছাড়া রেলপথ ও জাতীয় মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ২৪টি রেলওয়ে থানা এবং ৭৩টি হাইওয়ে থানা কাজ করছে। একটি প্রশাসনিক থানার আওতায় সাধারণত সুবিশাল ভৌগোলিক এলাকা এবং একাধিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আরো পড়ুন

অথচ দেশের এ ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে কার্যক্রম চালানোর মতো টহল ও অপারেশনাল গাড়ি রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি। সেই হিসেবে থানাগুলোতে গড়ে ২টিরও কম টহল গাড়ি রয়েছে। এ অল্পসংখ্যক যানবাহন দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় টহলসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে একই সময়ে কোনো থানায় একটি টিম অপারেশনে বের হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল কিংবা জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

নথিতে বলা হয়, সাধারণ পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি থানায় একই সময়ে একাধিক জায়গায় কার্যকর টহল নিশ্চিতে সর্বনিম্ন ৪-৫টি পিকআপ বা টহলযান থাকা আবশ্যক। এ ছাড়া ব্যস্ত, অধিক জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে এ সংখ্যা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত যানবাহন থাকলে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল পরিচালনা করা সম্ভব হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বিদ্যমান গাড়িগুলোর মেয়াদকাল।

নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে থানাগুলোতে ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যা ১ হাজার ২৩৭টি। যার ৬৪ শতাংশ যানবাহনই ১০ বছরের অধিক পুরাতন। দীর্ঘদিনের পুরোনো এসব গাড়ি ঘন ঘন বিকল হয়ে পড়ায় অপরাধীকে ধাওয়া করা, ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত আলামত সংগ্রহ এবং আইনপ্রয়োগকারী দলের জরুরি পৌঁছানো বিলম্বিত হচ্ছে।

এ সংকট থেকে উত্তরণ ও টহল সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক সেবামুখী পুলিশ বাহিনী গড়ার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটির মাধ্যমে দেশের স্থল ও নৌপথে টহলের জন্য ৫ হাজার ৮৩০টি নতুন বিশেষায়িত, অপারেশনাল যানবাহন এবং স্পিডবোটসহ জলযান কেনা হবে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। চলতি বছরে শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্প দুটি শেষ করতে চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৫ অক্টোবর চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। ওই সভায় পুলিশের বিশেষ যানবাহন কেনার প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে গত ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিশদ আলোচনা শেষে প্রকল্প দুটিকে একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

৪৩২৮ কোটি টাকার অপারেশনাল প্রকল্প: কেনা হবে ৪৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন

পুলিশ বাহিনীর যানবাহনের ঘাটতি মেটাতে ও থানাগুলোর নিয়মিত গতিশীলতা বাড়াতে গ্রহণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ শীর্ষক প্রকল্প। ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত।

প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই ব্যয় হবে যানবাহন ও জলযান কেনায়।

নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৮২৯টি যানবাহন ও জলযান কেনা হবে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর এ যানবাহনগুলো ড্রাইভিং ও অফিশিয়াল রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। যানবাহনগুলো দীর্ঘদিন সচল রাখা ও নিজস্ব ওয়ার্কশপে মেরামতের জন্য ১ সেট আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কেনা হবে, যার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। গাড়ি চালানোর দক্ষতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে ৬৫০ জন হালকা যান চালক ৩০০ জন ভারী যান চালককে এবং ৫০ জন ভেহিক্যাল মেকানিককে অভ্যন্তরীণ ড্রাইভিং ও অটোমোবাইল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এজন্য খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৪ কোটি টাকা।

নৌপথ ও উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার

শুধু সড়ক নয়, নৌপথেও যুক্ত হবে নতুন যান। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌপথে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নৌপথে সংঘটিত বা নৌপথ ব্যবহার করে পরিচালিত যে কোনো বড় ধরনের হুমকি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অথবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

নদীপথে নিয়মিত টহল পরিচালনা, অপরাধী গ্রেপ্তার, জাটকা নিধন প্রতিরোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা প্রদানসহ কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদারকরণে স্পিডবোট ও কান্ট্রি বোটের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এসব নৌযান জরুরি মুহূর্তে নদীপথে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ পুলিশের সামগ্রিক যানবাহন সক্ষমতা নিরূপণের ক্ষেত্রে স্থলযানের পাশাপাশি নতুন স্পিডবোট ও কান্ট্রি বোট সংস্থান রাখা হয়েছে।

যুক্ত হচ্ছে ১০০১টি বিশেষায়িত বাহন, খরচ হবে ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা

জরুরি পরিস্থিতি, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জটিল অপরাধ তদন্তের সীমাবদ্ধতা দূর করতে আলাদাভাবে নেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ শীর্ষক প্রকল্প। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ১ হাজার টি হাই-টেক বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হবে, যার জন্য ব্যয় হবে ২ হাজার ২২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা বা উগ্র বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কেনা হবে রাইট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল, পাহাড়ি অঞ্চল, নদীচর ও সড়কবিহীন দুর্গম এলাকায় যেখানে সাধারণ গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে অপরাধী দমনে কেনা হবে অল টেরেইন ভেহিক্যাল। মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের অপারেশন পরিচালনার সময় ভ্রাম্যমাণ কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কেনা হবে মোবাইল কমান্ড সেন্টার।

এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় কেনা হবে ক্রাইম সিন ভ্যান। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফরেনসিক প্রমাণ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ আলামত নিরাপদে সংগ্রহ ও সংরক্ষণে তাৎক্ষণিক ল্যাব সুবিধা দেবে এ ভ্যানগাড়ি। এ প্রকল্পের আওতায় ৭৮৩টি বিশেষায়িত যানের রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ৫ কোটি ৮৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং ৯১০ জন চালক-মেকানিক ও ৫০ জন মেকানিকের প্রশিক্ষণে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করা হবে।

বিদেশ সফর ও পিএসআই বাতিল

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্প দুটি গত সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়। এরপর গত ১৫ অক্টোবর প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভায় বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও বিদেশ সফরসহ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ছাঁটাই ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোবাইল সার্ভিলেন্স ভেহিক্যাল বা বিশেষায়িত যান ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) ও বিদেশ সফর সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলে ড্রাইভিং ও টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ‘প্রিন্টিং ও বাঁধাই’ অঙ্গে ৩ লাখ টাকা, ‘পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি’ অঙ্গে ৭ লাখ ৯২ হাজার থেকে ৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং ‘কার্যালয়ের আসবাবপত্র’ অংশে ১ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করে বাকি অতিরিক্ত থোক বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে।

একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্প সংশোধন করে পাঠানোর পর একনেকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।

সুপারিশে বলা হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে ঘোষিত ‘জনবান্ধব ও সেবামুখী পুলিশ গঠন’ অঙ্গীকারের সঙ্গে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ । প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের যানবাহন সংকট ও টিওঅ্যান্ডই ঘাটতি পূরণ হবে। এর ফলে যেকোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতে পুলিশ জনসেবায় দ্রুত সাড়াদান নিশ্চিত করতে পারবে।

source: Asia Post

Back to top button