ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার জনতুষ্টিবাদী প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ পদত্যাগ করেছেন। প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মধ্যে তিনি আগাম সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আগামী ২৫ অক্টোবর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভুচিচের পদত্যাগের পর দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথও খুলেছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) নিজের লিখিত পদত্যাগপত্র পড়ে শোনানোর সময় ভুচিচ বলেন, ‘আমি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করছি’। এদিন সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএসকে তিনি বলেন, বিদেশি শক্তি এবং দেশের কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি নির্বাচনের রাতে অশান্তি সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।
ভুচিচের পদত্যাগের পর সংসদের স্পিকার ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রনাবিচ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন। সার্বিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ভুচিচের দ্বিতীয় ও শেষ পাঁচ বছরের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামী বছরের মে মাসে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, তিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এ কারণে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে (এসএনএস) নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন। দলটি সরকার গঠন করতে পারলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।
শাসক এসএনএস একটি ছাত্র-সমর্থিত আন্দোলনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ঘটনাটির জন্য জবাবদিহি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তা শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাপক অসন্তোষের মধ্যেও ভুচিচের দল ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। অক্টোবরের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র। প্রধানমন্ত্রী পদে ভুচিচের প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তকে তার দলের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভুচিচ সরকারপন্থি গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশজুড়ে সফর করেছেন। তিনি নতুন সড়ক উদ্বোধন করেছেন, আর্থিক সহায়তা ও ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন এবং ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
সার্বিয়ায় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। তবে ভুচিচ তার দুই মেয়াদে দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে সরকারি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়মিত ঘোষণা করতেন।
ভুচিচ ও তার দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমালোচনামূলক গণমাধ্যমসহ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ওপর দমনপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এসএনএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দলটি বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
ছাত্র-সমর্থিত নির্বাচনী তালিকায় স্বল্প পরিচিত বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে প্রচারণার অংশ হিসেবে ছাত্রদলগুলো সাইকেলে করে দেশজুড়ে ভ্রমণ করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, গণভোটের মতো আবহে ছাত্র-সমর্থিত আন্দোলন ও ভুচিচের দল জনমত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনে ভুচিচের মিত্র সোশ্যালিস্ট পার্টি, ইউরোপপন্থী বিরোধী জোট এবং আরও কয়েকটি ছোট দলও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
কর্তৃপক্ষ পুলিশি সহিংসতা ও আটকের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দমন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ভুচিচ কোনো প্রমাণ না দিয়েই তার বিরোধী ও সমালোচনাকারী গণমাধ্যমকে অনির্দিষ্ট বিদেশি প্রভাবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ধ্বংসের চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন।
source: Asia Post







