চুক্তির চেয়ে ৩৯ শতাংশ কম কনটেইনার, বৈষম্যের অভিযোগ জিসিবি অপারেটরদের

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) কনটেইনার ও জাহাজের বরাদ্দ চুক্তির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে পরিচালকদের আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এই সংকটের পেছনে বন্দরের বৈষম্যমূলক নীতিকেও দায়ি করছেন সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা।
এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে জিএসবির ৬টি কনটেইনার বার্থের পরিচালকরা।
বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া সেই চিঠির একটি কপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে। চিঠিতে অভিযোগ করে বলা হয়, এনসিটি ও সিসিটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কনটেইনার দেওয়া হচ্ছে এবং জিসিবি নির্ভর করছে উপচে পড়া ট্রাফিকের ওপর।
ফজলিসন্স লিমিটেড থেকে দেওয়া সেই চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি, নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) মধ্যে চুক্তির শর্ত ও দর পুনর্বিবেচনাসহ কনটেইনারবাহী জাহাজের যৌক্তিক বন্টনের দাবি জানিয়েছে।
সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া ১৪ পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮-এর অধীনে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান’ চাওয়া হয়েছে। জিসিবির অন্যান্য বার্থ পরিচালকরাও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
চুক্তির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৯.৪ শতাংশ ঘাটতি
ফজলিসন্সের চিঠিতে বলা হয়েছে , ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৭ মাসে ৫ বছরের চুক্তির আওতায় জিসিবি ৯নং বার্থের ৭ লাখ ২১ হাজার ৩৫৬টি কনটেইনার হ্যান্ডল করার কথা ছিল যা গড়ে মাসে ১৫ হাজার ৩৪৮টি।
কিন্তু বার্থটি হ্যান্ডল করেছে মাত্র ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯৬টি কনটেইনার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০টি বা ৩৯.৪ শতাংশ কম। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চুক্তি অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও সক্ষমতা বজায় রাখতে তারা বাধ্য, তাই নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়নি।
এফকিউ খান অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু শরিফ জানান, ২০২২ সালের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ১৫ হাজার ৩৪৮টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের আশ্বাসে তারা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু এখন মাসে তারা মাত্র ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার কনটেইনার পাচ্ছেন, যা চুক্তির কাঠামোগত ভিত্তি বাস্তবায়নের অর্ধেকেরও কম।
তিনি আরও বলেন, কাজের পরিধি কমলেও সংগতি রেখে নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয় কমেনি। চুক্তি অনুযায়ী তাদের প্রায় ৭.৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়েছিল। যা কাজের বর্তমান পরিধি অনুযায়ী হওয়া উচিত ছিল প্রায় ২.৫ কোটি টাকা। প্রয়োজনহীন অতিরিক্ত ব্যাংক গ্যারান্টির পেছনে বার্ষিক প্রচুর সুদ গুণতে হচ্ছে। বরাদ্দ কমে যাওয়ায় জনবল ও অন্যান্য পরিচালন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এনসিটি ও সিসিটি পাচ্ছে বেশি বরাদ্দ
ফজলিসন্স ২০২৬ সালের জুলাইয়ের তথ্য উল্লেখ করে জানায়, এনসিটি-তে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭২২টি এবং সিসিটিতে ৪৬ হাজার ২৯টি কনটেইনার হ্যান্ডল করা হয়েছে, যেখানে ফজলিসন্সের ৯নং বার্থে মাত্র ৭ হাজার ৯৬৩টি কনটেইনার গেছে। অভিযোগে বলা হয়, এনসিটি ও সিসিটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কনটেইনার দেওয়া হচ্ছে এবং জিসিবি নির্ভর করছে উদ্বৃত্ত বা উপচে পড়া ট্রাফিকের ওপর।
আবেদনে ২০২৩ সালের ২৮ মার্চের সিপিএ বোর্ডের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলা হয়, বৈশ্বিক মন্দা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজের আগমন কমলেও সিসিটি, এনসিটি ও জিসিবির মধ্যে যুক্তিসঙ্গত হারে বার্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনও (বিওএ) ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এনসিটি ও সিসিটির তুলনায় জিসিবিতে জাহাজ বরাদ্দ কমানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর তিনটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা পরিচালনা করে- এনসিটি, সিসিটি এবং জিসিবি (যার রয়েছে ১২টি বার্থ, ৬টি কনটেইনার এবং ৬টি বাল্ক ক্যারিয়ারের জন্য)। ৬টি কনটেইনার বার্থ পরিচালনা করছে এমএইচ চৌধুরী লিমিটেড, এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড, বশির আহমেদ, এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স, ফজলিসন্স লিমিটেড এবং এফকিউ খান অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড।
বন্দরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি সুবিধায় মোট ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডল হয়েছে, যার মধ্যে জিসিবির ৬টি বার্থে এসেছে ১০ লাখ ৩৭ হাজার ১৯৬ টিইইউএস যা মোট বরাদ্দের প্রায় ২৯ শতাংশ।
বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ফজলিসন্স লিমিটেডের মালিক ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, জিএসবির বার্থগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত বা বাড়তি জাহাজ জিসিবিতে পাঠানো হচ্ছে, যা গুরুতর পরিচালন ও বাণিজ্যিক বৈষম্য তৈরি করছে। এই ধারাবাহিক বৈষম্য জিসিবি পরিচালকদের ব্যবসা এবং ৬টি বার্থের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিকের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এদিকে, এমএইচ চৌধুরী লিমিটেড রবিবার সিপিএর কাছে একটি চিঠি জমা দিয়ে কনটেইনার ট্রাফিক বন্টন পুনর্বিবেচনা এবং পিপিএ ২০০৬ ও পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী চুক্তির হার সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিপিএ সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, আবেদনপত্র পাওয়ার পর চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ বা আনুষ্ঠানিক জবাব জানানো হবে।
source: Asia Post







