News

ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন যারা

ভারতীয় সিনেমার বিভিন্ন ভাষা ও ইন্ডাস্ট্রির তারকাদের মিলনমেলায় পরিণত হলো ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসর। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) গুজরাটের একতা নগরে প্রথমবারের মতো বসে এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে ২০২৪ সালের সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণ করেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পী ও কলাকুশলীরা।

এবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন বলিউড তারকা কার্তিক আরিয়ান ও মালয়ালম সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা মাম্মুট্টি। ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য কার্তিক এবং ‘ব্রহ্মযুগম’-এ অভিনয়ের জন্য মাম্মুট্টি এই সম্মান পেয়েছেন। অন্যদিকে ‘আর্টিকেল ৩৭০’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার উঠেছে ইয়ামি গৌতমের হাতে।

কার্তিক আরিয়ানের জন্য এটি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সম্মাননা পাওয়ার পর তিনি জানান, এই অর্জনে তার পরিবার যেমন আনন্দিত, তেমনি উচ্ছ্বসিত সিনেমাটির পুরো দলও। ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’ নির্মাণের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল অনুপ্রেরণাদায়ী একটি গল্প দর্শকের সামনে তুলে ধরা। বিশেষ করে প্যারালিম্পিয়ানদের জীবন ও সংগ্রাম থেকে দর্শক যে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, সেটিকেই নিজের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন কার্তিক। একই সঙ্গে বিচারকমণ্ডলী ও দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

মাম্মুট্টির জন্য এবারের স্বীকৃতি আরও একটি মাইলফলক। ‘ব্রহ্মযুগম’-এর অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারটি তার ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেরা অভিনেতার সম্মান। মঞ্চে পুরস্কার নিতে ওঠার সময় তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান উপস্থিতরা।

‘আর্টিকেল ৩৭০’-এর জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়া ইয়ামি গৌতমও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জানান, এই সম্মান তাকে যেন আবার নতুন করে অভিনেত্রী হওয়ার অনুভূতি দিয়েছে। একই সিনেমা পেয়েছে সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার। ফলে এবারের আসরে ছবিটির জন্য এসেছে একাধিক বড় স্বীকৃতি।

তবে এবারের অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা অনন্ত নাগ। ভারতীয় সিনেমায় দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দেওয়া হয়েছে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় কাজ করেছেন এই অভিনেতা।

পরিচালনার ক্ষেত্রেও এসেছে উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। ‘স্বাতন্ত্র্য বীর সাভারকার’ সিনেমার জন্য সেরা নবাগত পরিচালক হয়েছেন রণদীপ হুডা। আর ‘ভক্ষক’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন সঞ্জয় মিশ্র।

হিন্দি সিনেমার জন্যও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। ‘শ্রীকান্ত’ পেয়েছে সেরা হিন্দি ফিচার ফিল্মের পুরস্কার। সিনেমাটির পরিচালক তুষার হিরানন্দানি জানিয়েছেন, শুধু বক্স অফিসের সাফল্য বা পুরস্কারের কথা মাথায় রেখে তিনি সিনেমাটি তৈরি করেননি। একটি গল্প বলার তাগিদ থেকেই ‘শ্রীকান্ত’ নির্মাণ করেছিলেন তিনি। জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি সেই গল্প বলার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে বলে জানান পরিচালক।

নাচের জগতেও এসেছে জাতীয় স্বীকৃতি। ‘স্ত্রী ২’-এর জনপ্রিয় গান ‘আজ কি রাত’-এর কোরিওগ্রাফির জন্য সেরা কোরিওগ্রাফারের পুরস্কার পেয়েছেন বিজয় গাঙ্গুলি। গানটি শিশুদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠা থেকেই দর্শকের সঙ্গে এর সংযোগের বিষয়টি তারা বুঝতে পেরেছিলেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নৃত্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের আলাদা সীমারেখা না রাখার কথাও বলেন বিজয়।

প্লেব্যাকেও এসেছে আঞ্চলিক ভাষার প্রতিনিধিত্ব। মারাঠি সিনেমা ‘ঘরাট গণপতি’র ‘নভসাচি গৌরী মাজি’ গানের জন্য সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কার পেয়েছেন অভয় যোধপুরকর। নিজের মাতৃভাষায় গাওয়া একটি গান জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার খবর শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। গণেশ চতুর্থীর সময় পাওয়া এই সম্মানকে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন গায়ক।

‘পুষ্পা ২: দ্য রুল’-এর পোশাক পরিকল্পনার জন্য সেরা পোশাক পরিকল্পনার পুরস্কার পেয়েছেন শীতল ইকবালচাঁদ শর্মা ও দীপালি নূর। সিনেমাটির পোশাক নিয়ে প্রায় তিন বছর কাজ করতে হয়েছে তাদের। বিশেষ করে আল্লু অর্জুনের দেবীর সাজ তৈরি করতে আলাদা করে গবেষণা করতে হয়েছিল। চরিত্রটির পুরুষসুলভ উপস্থিতি এবং শাড়ির উপস্থাপনাকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আঞ্চলিক ও আদিবাসী ভাষার সিনেমাও পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। সাঁওতালি ভাষার স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘অ্যাঙ্গেন’-এর জন্য সেরা নবাগত অ-ফিচার চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েছেন রবি রাজ মুর্মু। মাত্র ১২ মিনিটের এই সিনেমাটি শিক্ষার্থীদের চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখানোর একটি কর্মশালার অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজেদের সম্প্রদায়ের নতুন নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণে আরও উৎসাহিত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন পরিচালক।

এদিকে ‘ক্যাপ্টেন মিলার’ সিনেমাটিও পেয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি। জাতীয়, সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যবোধ তুলে ধরার জন্য ছবিটিকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছে। সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য বিশেষ উল্লেখ পেয়েছেন ধনুশ।

সব মিলিয়ে এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বলিউডের পাশাপাশি মালয়ালম, তামিল, মারাঠি, সাঁওতালি ও অন্যান্য ভাষার সিনেমার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালের সিনেমাকে ঘিরে আয়োজিত এই আসর তাই শুধু তারকাদের পুরস্কার পাওয়ার অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি, বরং ভারতের বহুভাষিক ও বহুরঙের চলচ্চিত্র সংস্কৃতিরও একটি চিত্র তুলে ধরেছে।

এবারের আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্থান পরিবর্তন। এতদিন দিল্লিকেন্দ্রিক এই অনুষ্ঠান এবার প্রথমবারের মতো গুজরাটের একতা নগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনস্থলেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আয়োজন করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

source: Asia Post

আরো দেখুন
Close
Back to top button