News

হুতিদের নিয়ন্ত্রণে সৌদির অনুরোধ, ইরানকে ‘গোপনে’ চাপ দিচ্ছে চীন

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেহরানকে ‘গোপনে’ সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে চীন। সৌদি আরবের অনুরোধের পর বেইজিং গোপনে ইরানকে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগানোর জন্য বলেছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ইরানি সূত্র জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানায় সূত্রগুলো। এ পরিস্থিতিতে হুতিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সোদি আরব চীনের সহায়তা চেয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, সৌদি আরবের এই অনুরোধের পর চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানালেও, ইরানকে দেওয়া তাদের গোপন বার্তা ছিল আরও সরাসরি। বেইজিং চায়, হুতিদের ওপর তেহরানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংঘাত যেন লোহিত সাগরসহ চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে।

চীনের বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত
চীনের বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

আলোচনার বিষয়ে অবগত তিন ইরানি সূত্র পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে চীনের বার্তা ঠিক কীভাবে তেহরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে, তা তারা জানায়নি। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, বেইজিংয়ের এই বার্তার জবাবে তেহরান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরিয়ে আনা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ওপর নির্ভর করছে। তবে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাতে ইরান ব্যর্থ হলে চীন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দেবে— এমন কোনো স্পষ্ট হুমকি বা ইঙ্গিত চীনা কর্মকর্তারা দেননি।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “চীন চায় না আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে পৌঁছাক। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানো কোনো পক্ষের স্বার্থেই নয়।”

মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, “সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানো উচিত এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে— এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানায় চীন। একই সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।”

এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির প্রধান তেল ক্রেতা। বাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।

মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ইরানকে প্রভাবিত করে হুতিদের লাগাম টানার মতো সক্ষমতা যেসব দেশের রয়েছে, চীন তাদের অন্যতম।

১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় প্রভাবের বিরোধিতা করে হুতিদের উত্থান ঘটে। ইরানি সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা পায়। তেহরানের পশ্চিমা ও ইসরায়েলবিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবেও হুতিদের বিবেচনা করা হয়।

ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের যেকোনো ধরনের হুমকি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এতে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকার মধ্যে লোহিত সাগরে জাহাজ বা বন্দরগুলোতে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির দুটি প্রধান পথ একই সঙ্গে ব্যাহত হবে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতও আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের ভাষ্য, ইরান ও তার মিত্ররা গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার দুই প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করছে। আর চীন এই দুই পথের ওপরই নির্ভরশীল।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বেইজিং তেহরানের ওপর মার্কিন চাপের বিরোধিতা করতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ শুধু ইরানকেন্দ্রিক নয়। চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে এই অঞ্চল থেকে। পাশাপাশি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার।

ভাতানকার ভাষায়, “ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একপর্যায়ে এই সক্ষমতা সেই শক্তিরই ক্ষতি করতে শুরু করে, যার ওপর তেহরান ক্রমেই বেশি নির্ভর করছে।”

চীনের জন্যও জটিল সমীকরণ

বেইজিংয়ের উদ্বেগের পর তেহরান হুতিদের ওপর বাস্তবে প্রভাব খাটাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বৈরিতার মধ্যে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতি এবং তেলশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অর্থ জোগানোর সক্ষমতা যেসব দেশের রয়েছে, চীন তাদের অন্যতম। এ কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তেহরানের জন্য উপেক্ষা করার মতো নয়।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীন ইরানে নিজের প্রভাবের প্রমাণ দিয়েছে। ২০২৩ সালে দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল বেইজিং।

তবে চীনের প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তিতে সই করার পরও অ-তেল খাতে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ প্রত্যাশার তুলনায় কম— এ নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের তুলনায় ইরানে বিনিয়োগ কম হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইরানি সূত্রগুলোর মতে, তেহরানের সিদ্ধান্তে চীনের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন অগ্রাধিকারের সমন্বয়েই ইরান তার সিদ্ধান্ত নেয়।

ওই পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, “তেহরান ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন। চীন এমন একটি বিষয়, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। আর বেইজিং চায় হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হোক এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা হোক।”

বিশ্লেষকদের মতে, চীন তার এই উদ্বেগের সঙ্গে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ বা চাপ যুক্ত করে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের ওপর নিজের প্রভাব ব্যবহার করে হুতিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে বেইজিং কতটা প্রস্তুত, তা সামনের দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে।

source: Rajneete

Back to top button