News

ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড/হাসপাতালে ভর্তি ছিল ছেলে, হুড়োহুড়িতে মারা গেলেন মা

ময়মনসিংহ মেডেকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে লাগা অগ্নিকাণ্ডের সময় সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে কুলসুমা নামে এক নারীর মৃত্যুর তথ্য তার পরিবারের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা হয় তার ননদ নাজমা আক্তারের।

ফোনে নাজমা আক্তার জানান, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামে। তার ভাই শহীদুল ইসলামের ১২ বছর বয়সি ছেলে মো. স্বাধীন অসুস্থ ছিল। ছেলের চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসেন তার মা কুলসুমা।

নাজমা আক্তার বলেন, আমার ভাবি তার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের সময় অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে চেষ্টা করেন তিনি। ওই সময় হুড়োহুড়িতে সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা যান আমার ভাবি। ছেলে ঠিকই বেঁচে আছে, শুধু ভাবি চলে গেল।

তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের অত্যন্ত আদরের সন্তান স্বাধীন। সে জন্ডিসে আক্রান্ত। ১১দিন ধরে সে হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ভর্তি। আগুন লাগলে প্রচণ্ড ধোঁয়া ষষ্ঠ তলায় প্রবেশ করে। আমার ভাবিও অন্যদের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে নিচে নামতে থাকেন। ষষ্ঠ তলা থেকে চার তলা পর্যন্ত আসতে তিনি হঠাৎ নিচে পড়ে যান। মানুষের ভিড়ে পেট, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার প্রায় এক ঘন্টার মধ্যে মারা যান।

নাজমা আক্তার বলেন, আমার ভাতিজা মাথায় আঘাত পেয়েছে। আমর ছোট ভাতিজি মীম পায়ে ব্যথা পেয়েছে। ভাবির শরীর কিংবা মাথায় রক্তাক্ত জখম দেখিনি আমরা। তার পেট ফুলে গিয়েছিল। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

এর আগে, এদিন, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মমেক হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুন লাগে। ভবনটির আট তলায় লিফট কন্ট্রোল রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিসের। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় এক ঘন্টার চেষ্টা আগুন ও ধোঁয়া সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে

এদিন রাত ১১টার দিকে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার হাসপাতালের জরুরী বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়–আগুন লাগার ঘটনায় রোগী ও রোগীর স্বজনদেন মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা হাসপাতালের খোলা থাকা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় এক শিশুসহ ছয়জন মারা যান।

তার দেওয়া তথ্যমতে মৃত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা, ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান, একই উপজেলার রমজান, জাহানারা এবং নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম।

তাদের মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনা যে ভবনটিতে ঘটেছে (নতুন ভবন) সেই ভবনটিতে জরুরিভাবে দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার জন্য বা বাহির থেকে উদ্ধার কাজের জন্য বা বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সেখানে চারটি সিড়ি থাকার পরও সেগুলোকে সব সময় তালাবন্ধ করে রাখা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার এ ব্যাপারে অবগত করার পরও তারা এগুলো খুলে রাখার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

তিনি বলেন, অনেকবার অগ্নিকাণ্ড ঘটার পরও একটি সিঁড়ি, যেটি দিয়ে হাসপাতালের রোগীরা এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনরা চলাচল করে এই সিঁড়িটি ছাড়া অন্য সব সিঁড়ি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। সিঁড়িগুলো তালাবন্ধ করে রাখার কারণে আগুন লাগার সময় মানুষ একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে বের হওয়াতে পদদলিত হয়ে তারা মারা গেছেন।

মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পর হাসপাতালে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার, পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।

বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার জানান, হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন–এমন প্রমাণ তিনি এখনও পর্যন্ত পাননি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ পেলে তিনি সেটা যাচাই করে দেখবেন।

তিনি বলেন, কোনো তথ্য নিশ্চিত না হয়ে বলা উচিত নয়। প্রকাশ করলে তাতে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এ সময় বিভাগীয় কমিশনার আরও জানান, হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, মর্গের তথ্য ছাড়াও তার কাছে আরও একটি তালিকা রয়েছে। সবগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত পরিস্থিতি বলা যাবে।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা সব বিষয় দেখবে।

পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন তালিকা যাচাই করছি। যাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তবে এখনও আমাদের হাতে কোনো কনক্রিট এভিডেন্স (সুনির্দিষ্ট প্রমাণ) আসেনি।

ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য কীভাবে এসেছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা যেভাবে শুনেছেন, আমরাও সেভাবেই শুনেছি। এখন সেই তথ্যই যাচাই করার জন্য সবাই সরেজমিনে এসে তদন্ত করছি। তথ্য নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, তিনিও ছয়জনের মৃত্যুর কথা শুনেছেন। খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

source: Asia Post

Back to top button