ডিসেম্বর ঘিরে নতুন কৌশলে আ.লীগ, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মিলল ভয়ংকর তথ্য

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আগামী ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা, পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি ডিসেম্বরকে ‘টার্গেট’ করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাসনে থাকা দলের নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানান তিনি। এরপর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানও ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তার এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
এসব বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, নিজেদের শক্তির জানান দিতে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছে। এর মধ্যে বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার এবং সুনামগঞ্জের ঘটনায় বেশ উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ সদর সপ্তর থেকে এ বিষয়ে সব ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার কারণে জেলার কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
জানা গেছে, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতাকর্মীরা পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ রাখছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড (সংকেতায়িত) অ্যাপ ব্যবহার করে তারা দেশ-বিদেশের পলাতক নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে তহবিলও গঠন করা হচ্ছে।
যে কৌশলে হাঁটছেন নেতাকর্মীরা
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ক্যাডাররা রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু আবাসিক এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে। এলাকাগুলো হলো ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা। এ ছাড়া ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও এসব এলাকায় আত্মগোপনে আছেন।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এবং নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত সচল রাখতে তারা নানা পেশা বেছে নিয়েছেন। কেউ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন। কেউ চালু করেছেন বিউটি পার্লার। কেউ আবার মোটরসাইকেলের শোরুম দিয়েছেন। অনেকে আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। কারও কারও নিয়ন্ত্রণে আছে কিছু অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেল। এর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে তথা আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা বিদেশে পলাতক যেসব নেতার সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, জাহাঙ্গীর আলম (গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র), নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু, পিরোজপুরের মহিউদ্দিন মহারাজ প্রমুখ।
সতর্ক থাকার নির্দেশ
বিশ্লেষক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় গণহত্যার পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে এত দ্রুত দেশে ফিরে আসা এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সহজ হবে না। তারা বলছেন, এটি মূলত কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল। তবে যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা ব্যাপক দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনেক টাকা আছে। টাকা খরচ করে তারা দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চালাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তারা সফল হতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যার ঘটনা দেশের মানুষের মনে এখনো টাটকা। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর চরম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি কোনো সহানুভূতি বা সমর্থন নেই।
তিনি বলেন, তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে। চরমপন্থি যোগাযোগ বা দেশি-বিদেশি চক্রান্তের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা যেন সফল না হতে পারে, সে জন্য আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ফ্যাসিস্টবিরোধী ঐক্য জোরদার করতে হবে।
মাঠে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তারা
পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল, এসআই ও এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা রয়ে গেছেন। তাদের কারও কারও সঙ্গে বিদেশে পলাতক সাবেক সরকারের শীর্ষ কিছু কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে আলোচনা আছে।
সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং গোপন নাশকতার ছক বাস্তবায়নের অগ্রিম বার্তা হিসাবে দেখছেন গোয়েন্দারা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়নি। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী ঢাকার অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আত্মগোপন করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন। তারা টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন। পাশাপশি ডিসেম্বরকে টার্গেট করে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরপরই নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে ধরনের অস্থিরতা ও নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের সহযোগিতায় যে কোনো বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিনিয়ত আমরা তাদের গ্রেপ্তার করছি। বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
সূত্র: যুগান্তর
source: Asia Post






