আলোচনা ব্যর্থ, কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের

দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটির প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দিনের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য দুই দেশই একে অপরকে দায়ী করেছে। শনিবার থেকে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
রোববার (২২ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, চূড়ান্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচকদের স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত (ইস্টার্ন টাইম) সময় বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কর্মকর্তারা জানান, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এরপরই কানাডার বেশ কিছু পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, নতুন করে আরোপ করা শুল্কের ‘সমপরিমাণ শুল্ক কানাডাও আরোপ করবে’।
এক বিবৃতিতে কার্নি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বের সেরা বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কানাডার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করেছি এবং গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছি। কিন্তু কানাডার জনগণের জন্য আমাদের লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে সেই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়।’
বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব থেকে কানাডার জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে তার সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তাও তুলে ধরেন কার্নি। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এই পরিস্থিতির জন্য কানাডাকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার যে সুযোগ কানাডার সামনে ছিল, দেশটি তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
শনিবার মধ্যরাতের পরপরই কানাডার প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়। এসব পণ্যের মধ্যে কাঠের তৈরি হকি স্টিকও রয়েছে, যেগুলো এখন খুব কমই ব্যবহার করা হয়। মেক্সিকোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডার অর্থনীতিতে নতুন এই শুল্ক বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মোট রপ্তানির মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি।
তবে নতুন শুল্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) নবায়নের জন্য বৃহত্তর আলোচনাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি জানিয়েছেন, তিনি বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছেন এবং নতুন শুল্কের জবাবে কানাডা ‘ডলার-ফর-ডলার’ অর্থাৎ সমপরিমাণ পালটা শুল্ক আরোপ করবে। তিনি বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং কানাডার আলোচকদের অটোয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছি।’
কার্নি আরও বলেন, ‘আলোচকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এসব আলোচনায় কানাডীয়দের স্বার্থ রক্ষায় আন্তরিকভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তবে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ছিল অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।’
দুই দেশের আলোচনার কয়েক ঘণ্টা আগেও একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর আভাস পাওয়া গিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, সম্ভাব্য ওই চুক্তিতে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোর বিষয় ছিল। পাশাপাশি কানাডার মদের দোকানে আবারও মার্কিন মদ বিক্রির পথ খুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল।
কিন্তু হোয়াইট হাউজে এক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘আজ রাতে কানাডা চলতি সপ্তাহের শুরুতে সম্মত হওয়া শর্ত অনুযায়ী বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এটি কানাডার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বের একটি সুযোগ হাতছাড়া করা। যুক্তরাষ্ট্র জি৭-এর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি।’
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিকারক বড় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক শুল্ক পরিস্থিতিতে থাকত কানাডা। তবে কানাডা বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও সফটউড কাঠের ওপর আরও কিছু ছাড় চেয়েছিল। ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক কার্যকর করার পর অতিরিক্ত কোনো আলোচনা নির্ধারিত নেই।
গত মাসে ট্রাম্প কানাডার বিভিন্ন পণ্যে নতুন করে একাধিক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল ওয়াইন, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার ছিপ ও হকি সরঞ্জাম।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় যেসব পণ্য শুল্ক সুবিধা পায় না, নতুন শুল্ক সেসব খাতকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। এর ফলে চাকরি হারানো এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়াশিংটনে তিন দিন ধরে আলোচনা করেন কানাডার যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঁ এবং গ্রিয়ার।
নতুন শুল্কের ফলে ইস্পাত, কাঠ ও গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকে আরোপ করা শুল্কের সঙ্গে আরও কিছু শুল্ক যুক্ত হলো। গত ১৮ মাসে এসব খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এই সংকট মূলত এসব খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
source: Rajneete







