News

ইরানে মার্কিন হামলায় বিরতি, তবু যুদ্ধ ছড়াচ্ছে লোহিত-কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় আপাতত বিরতি এসেছে। তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং যুদ্ধের বিস্তার এখন লোহিত সাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত পৌঁছেছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে তেহরান।

রোববার (২৬ জুলাই) রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নৌ অবরোধ ‘পূর্ণমাত্রায় কার্যকর’ রয়েছে। তবে টানা ১৩ রাত ধরে চলা ক্রমবর্ধমান বিমান হামলা কেন বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি তারা।

সপ্তাহান্তে ইরানের পক্ষ থেকেও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের হামলার জবাবে ইরান নিয়মিত পালটা পদক্ষেপ নিয়েছিল।

হামলায় বিরতির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প সব সময়ই স্পষ্ট করে বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানই তার প্রথম পছন্দ। তবে ইরান যদি আন্তরিকভাবে আলোচনার টেবিলে না আসে, তাহলে কী ঘটতে পারে, সেটিও তিনি তাদের দেখিয়ে দিয়েছেন।

শনিবার নিউইয়র্ক টাইমস দুইজন অবহিত সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, আপাতত ইরানের ওপর হামলা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প।

পত্রিকাটি বলেছে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত কমে যেতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, শুক্রবার হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ট্রাম্পের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

শনিবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, সামরিক অভিযান আপাতত ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে।

তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি থাকলেও শনিবারের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর এবার বিশ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লোহিত সাগরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, এ ঘটনাকে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ আখ্যা দিয়ে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান।

ইরানের এ অভিযোগের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণ তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে, যাতে তারা এ অঞ্চলে আরও কার্যকরভাবে হামলা পরিচালনা করতে পারে।

ইয়েমেনে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জানিয়েছেন, শনিবার সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবু শহরের স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, ইয়েমেন সীমান্ত-সংলগ্ন জিজানে অবস্থিত আরামকো শোধনাগারের দিক থেকে ঘন ধোঁয়া উড়ছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে এই শোধনাগারটির।

এশিয়াভিত্তিক দুটি জ্বালানি বাণিজ্য সূত্র জানিয়েছে, জিজানের জ্বালানি ও তেল সংরক্ষণ স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে তারা তথ্য পেয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি আরামকো।

ইয়ানবুতে তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত সৌদি আরবের প্রধান তেল রপ্তানি বন্দর ইয়ানবু বর্তমানে দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছে। কারণ, ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দেওয়ার পর সৌদি আরব এই পথ ব্যবহার করে তেল পরিবহন করছে।

হোদেইদায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হামলা

ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি-সমর্থিত সরকারের বিমান বাহিনী মারিব ও আল-জাওফ প্রদেশে হুতিদের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়িত উভয় পক্ষই এখন সামনের সারিতে নতুন করে সেনা সমাবেশ করছে।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই সৌদি আরব তাদের বিরুদ্ধে আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

দুর্ভিক্ষ ও দীর্ঘদিনের সংঘাতে লাখো মানুষের প্রাণহানির এই গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর অনেকটাই স্থগিত ছিল।

তবে চলতি মাসে সেই যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। পাঁচ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর সংঘাত শুরু হয়েছে, তাতে এখন কার্যত যোগ দিয়েছে হুতিরা।

গত সপ্তাহে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

source: Rajneete

Back to top button