News

ইরানের সঙ্গে আলোচনার ‘পরিকল্পনা নেই’ ট্রাম্পের, হরমুজ নিয়ে পালটাপালটি দাবি

ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে এর বিপরীতে ইরান বলেছে, প্রণালিটি এখনো বন্ধ।

বুধবার (১৯ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় মঙ্গলবার আবারও তেলের দাম বেড়েছে। একই সময়ে শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর এই সংকটের কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

সোমবার একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পর কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইরান ‘পুরোদমে আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে মঙ্গলবার দুই পক্ষের নতুন করে হামলার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প মঙ্গলবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথাবার্তা হচ্ছে না কিংবা নির্ধারিতও নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খোলা ও চালু আছে। সব নৌমাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে অথবা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।’

আরো পড়ুন

এর এক দিন আগে সোমবার ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার বেশ আশাবাদী সুরে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তা ‘সম্ভবত আরও জোরালো’।

প্রায় ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু হয়। এখন তা অনেকটা অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তারা আবারও হামলা চালাতে পারে।

ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আগে যেসব স্থানে হামলা চালিয়েছে, সেখানে মাটির নিচে সংরক্ষিত রয়েছে বলে ধারণা করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে না ফেললে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন

পারস্য উপসাগরীয় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও বিভিন্ন দেশ জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। ৪ মে ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার পর এটিই এ ধরনের প্রথম ঘটনা।

পরে এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ‘সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজ’ লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। তবে দুটি ক্ষেপণাস্ত্রই সাগরে পড়ে যায়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘অভিযোগ’ ভিত্তিহীন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে— এমন কারণ দেখিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল মাত্র জুনের শেষ দিকে আবার শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর মার্চের শুরুতেই সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছিল।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, মঙ্গলবার তারা একটি প্রতিবেদন পেয়েছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি একজন নাবিক হতাহত হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাকি নাবিকদের সহায়তা করছিল ওমানের কোস্টগার্ড। এ বিষয়ে তেহরানের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবারের প্রাথমিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পারাপারের সংখ্যা এক অঙ্কেই ছিল।

ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, জুনে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তির শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেহরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং সব ফ্রন্টে হুমকি ও সামরিক অভিযান বন্ধ করা।

১৭ জুন স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৃহত্তর একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এর মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করছেন না।

ওই চুক্তিতে ‘সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার’ কথা বলা হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে চুক্তিটি দ্রুত ভেঙে পড়ে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

আলোচনায় এখনো আগ্রহী ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে বসতে ইরান এখনো প্রস্তুত। তবে আলোচনা ও আত্মসমর্পণকে এক বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

মোখবের বলেন, সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা ইরানের সংকল্প ভাঙতে পারবে না। যুদ্ধ না চাইলেও দেশটি তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মিত্রদের রক্ষা করবে।

তবে যুদ্ধের মধ্যেও ইরান নিজেদের দৃঢ় অবস্থান দেখালেও দেশটির নেতারা উদ্বিগ্ন। তিনজন ইরানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আরও অর্থনৈতিক শাস্তির হুমকি দেশটির মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে, নতুন করে বিক্ষোভ উসকে দিতে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈধতা আরও দুর্বল করতে পারে।

এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের। ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।

যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একপর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। মঙ্গলবার ব্রেন্ট তেলের ফিউচারের দাম ২০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের কিছু বেশি দামে স্থির হয়েছে।

একাধিক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে প্রেসিডেন্ট আরও কঠোরভাবে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখেন।’

source: Rajneete

Back to top button