News

স্বেচ্ছায় মুসলিম হয়ে পছন্দের মানুষকে বিয়েতে কেউ বাধা দিতে পারে না: এলাহাবাদ হাইকোর্ট

স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বিয়ে করতে চাওয়া দুই বোনকে ঘিরে বিরোধের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি স্বাধীন ইচ্ছায় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের বাবাসহ অন্য কেউ এতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। তবে তাদের ধর্মান্তর ও বিয়ের সিদ্ধান্ত সত্যিই স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আগামী ৬ আগস্ট তাদের আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, বিচারপতি সন্দীপ জৈন ২০ ও ৩৫ বছর বয়সী দুই বোনের করা এক আবেদনের শুনানি করতে গিয়ে গত ৩১ জুলাই এ আদেশ দেন। আদালতে ওই দুই বোন দাবি করেন, তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আদালত তার আদেশে বলেন, “যদি শেষ পর্যন্ত এসব দাবি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে চতুর্থ বিবাদী (বাবা) বা অন্য কারও পক্ষ থেকে তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা তাদের সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত মর্যাদা, গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নিজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ওপর অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।”

নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের দাবি

দুই বোন আদালতে বলেন, তারা সুস্থ মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়স্ক এবং কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি, প্রলোভন বা অযাচিত প্রভাব ছাড়াই স্বেচ্ছায় হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন, যা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন থেকে উদ্ভূত সাংবিধানিক অধিকার।

তাদের আইনজীবী আলি বিন সাইফ ও দিনেশ কুমার যাদব আদালতে জানান, মেয়েদের স্বাধীন সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের বাবা ২০২৫ সালের ৪ মে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৮৭ ধারায় একটি মিথ্যা ও বিদ্বেষপ্রসূত এফআইআর দায়ের করেন। ওই ধারায় নারীকে অপহরণ, তুলে নেওয়া বা বিয়েতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে প্ররোচিত করার অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি, ওই অভিযোগের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দুই বোনের আইনসম্মত অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করা। তারা আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে দুই নারীকে অবৈধভাবে আটকে রাখা হয় এবং তাদের স্বাধীন চলাচলেও বাধা দেওয়া হয়।

তাদের আইনজীবীরা আদালতকে আরও বলেন, যেহেতু ধর্মান্তর স্বেচ্ছায় হয়েছে, তাই উত্তর প্রদেশের অবৈধ ধর্মান্তর নিষিদ্ধ আইন, ২০২১-এর বিধান এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এ ছাড়া নথিপত্রে এমন কোনো অভিযোগ বা প্রমাণও নেই, যা থেকে বোঝা যায় জোরপূর্বক, মিথ্যা তথ্য, অযাচিত প্রভাব, ভয়ভীতি, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে তাদের ধর্মান্তর করা হয়েছে।

‘প্রথম দায়িত্ব স্বাধীন ইচ্ছা নিশ্চিত করা’

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, দুই বোনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং ধর্ম, বিয়ে, বসবাস ও ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ইচ্ছামতো বিয়ে করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।

আদালতের মতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সত্যিই স্বাধীন ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি বেআইনিভাবে আটক বা কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছেন—তা নিশ্চিত করাই আদালতের প্রথম দায়িত্ব। তাই তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সিদ্ধান্তগুলো স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে কি না এবং তারা আইনসম্মতভাবে অবস্থান করছেন কি না, তা যাচাই করার জন্য আদালতে তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য।

এ অবস্থায় উত্তর প্রদেশ সরকার ও দুই বোনের বাবাকে আগামী ৬ আগস্ট তাদের আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। একই সঙ্গে তিন দিনের মধ্যে তাদের বাবার কাছে নোটিশ পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত আরও নির্দেশ দেন, নির্ধারিত দিনে যদি ওই দুই বোনকে আদালতে হাজির করা না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করতে হবে। সেখানে কেন আদালতের নির্দেশ পালন করা যায়নি, তাদের আদালতে হাজির করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের হাজির নিশ্চিত করতে আর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে।

বিচারপতি সন্দীপ জৈন বলেন, হলফনামায় অবশ্যই সৎ উদ্দেশ্যে, যথাযথ নিষ্ঠা ও কার্যকরভাবে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি আদালতের সামনে ওই দুই নারীকে হাজির নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে কী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাও উল্লেখ করতে হবে।

source: Rajneete

Back to top button