ইরানের স্বার্থে সৌদি আরবকে কীভাবে চাপের কেন্দ্রে পরিণত করছে হুতিরা

ইয়েমেনের হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আয়োজন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য শুধু সৌদি আরবকে সামরিকভাবে চাপে রাখা নয়, দেশটির অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভাবমূর্তিতেও আঘাত করা। এর মধ্য দিয়ে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে ওয়াশিংটনের নীতি বদলাতে না পেরে ইরান তার আঞ্চলিক মিত্র হুতিদের মাধ্যমে সৌদি আরবকে চাপে ফেলছে। তেহরানের হিসাব, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলা মার্কিন অবরোধ শিথিল করতে রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারেন।
অর্থাৎ, হুতিদের হামলায় সরাসরি লক্ষ্য সৌদি আরব হলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সংঘাতে। একই সঙ্গে ইয়েমেন নিয়ে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়েরও সুযোগ খুঁজছে হুতিরা।
কেন সৌদি আরবকে লক্ষ্য করছে হুতিরা?
সৌদি আরবকে চাপে ফেলার পেছনে দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে রিয়াদ। পর্যটন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে দেশটিকে গড়ে তোলাই এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সৌদি আরবের জন্য নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি ধরে রাখা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন, দেশটির রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে যেতে পারেন।
হুতিদের হামলার কৌশলে এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কৌশলগত উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের মাইকেল নাইটসের মতে, ইরানের পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তেহরান এখন ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টির পথ বেছে নিচ্ছে।
তার ভাষায়, ইরান যেন ‘চোকহোল্ডে’ আটকে আছে। সরাসরি ওয়াশিংটনকে বাধ্য করতে না পেরে তারা সৌদি আরবের দুর্বল জায়গায় আঘাত করছে। নাইটসের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের পর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বেড়েছে। সেই চাপের পালটা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে তেহরান।
তেল স্থাপনার পাশাপাশি বিনিয়োগ আয়োজনেও আঘাত
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবে হুতিদের হামলা বেড়েছে। গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকবার প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে। এতে আগুন ছড়িয়ে ভবনটির কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকো সৌদি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে হুতিদের লক্ষ্য শুধু তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় আঘাত হানা নয়; দেশটির আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাদের হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে।
রিয়াদে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেলবিষয়ক সম্মেলন হামলার কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন তেল নির্বাহী সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সময়ে বার্ষিক ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) সম্মেলনে অনলাইনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থাও করতে হয়েছে।
এফআইআই সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরার অন্যতম আন্তর্জাতিক আয়োজন। বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সামনে নিজেদের বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করে রিয়াদ।
এমন একটি আয়োজনের সময় রাজধানীতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হলে তা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ফলে হামলার প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইরানের স্বার্থ কোথায়?
ইরান হুতিদের প্রধান আঞ্চলিক সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তেহরান গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহায়তার পাশাপাশি অস্ত্রও সরবরাহ করে। ফলে ইরানের ওপর মার্কিন চাপ বাড়লে হুতিদের সহায়তার প্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইরানের ওপর চাপ শিথিল হলে হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ানোকে ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা। তেহরানের লক্ষ্য, সৌদি আরবকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা, যাতে দেশটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানকে ঘিরে চলমান বিরোধ কমানোর উদ্যোগ নেয়।
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, হুতিদের হামলা ইরান ও তার মিত্রদের এমন একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়া। এ কৌশলে জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবকে বুঝতে হবে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে থাকা সম্ভব নয়। রিয়াদকে বরং আলোচনার পথ বেছে নিতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর থেকে বিধিনিষেধ না সরালে হুতিদের হামলা চলতে থাকবে।
তবে হুতিদের সব পদক্ষেপকে ইরানের নির্দেশে পরিচালিত অভিযান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইয়েমেনে নিজেদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠারও আলাদা লক্ষ্য রয়েছে গোষ্ঠীটির।
সৌদি আরবের অবস্থান সম্পর্কে অবগত দুই সৌদি সূত্র এবং তিনটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, হুতিদের দাবির মধ্যে রয়েছে সৌদি সামরিক অভিযান বন্ধ করা, ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, ইরানের সঙ্গে নিয়মিত বিমান যোগাযোগ চালু করা, সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধ এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন বন্ধ করার দাবিও রয়েছে তাদের।
এসব দাবি মেনে নেওয়া হলে ইয়েমেনের বড় একটি অংশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হতে পারে।
তবে ইরানের নির্দেশে হামলা চালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন হুতিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুসসালাম। তার বক্তব্য, তাদের দাবিগুলো দীর্ঘদিনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ঘিরে। ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং দেশটির নিজস্ব সম্পদ থেকে সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়ার বিষয়গুলোই এসব দাবির কেন্দ্রে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাদের মানবিক দাবির সঙ্গে ইরান বা অন্য কারও সম্পর্ক নেই।
মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে কঠিন সমীকরণ
হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে মূলত দুটি পথ— সামরিক চাপ বাড়ানো অথবা গোষ্ঠীটির সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া। কিন্তু দুই পথেই ঝুঁকি রয়েছে।
সামরিক অভিযান জোরদার করলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও ভিশন ২০৩০ কর্মসূচিতে।
অন্যদিকে, হুতিদের বড় ধরনের ছাড় দিলে গোষ্ঠীটি নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। ইয়েমেনে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রভাবও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, হুতিরা এখন নিজেদের এমন অবস্থানে দেখছে, যেখান থেকে তারা শক্তির জায়গা থেকে আলোচনা করতে পারে।
তার ভাষায়, হুতিদের বর্তমান দাবিগুলো অনেকটা ‘বিজয়ীর শান্তি’র মতো।
অর্থাৎ, শুধু যুদ্ধ বন্ধ করাই তাদের লক্ষ্য নয়; এমন সমঝোতা আদায় করা, যাতে ইয়েমেনে তাদের কর্তৃত্ব কার্যত স্বীকৃতি পায় এবং তাদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ অনেকটাই উঠে যায়।
তবে সৌদি আরবের অবস্থানও কঠোর হচ্ছে। সৌদি-ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, সৌদি নেতারা এখন সামরিক চাপকেই একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যেখানে আর আলোচনার সুযোগ নেই; সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা
সৌদি আরবের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো, হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা আগ্রহী, তা স্পষ্ট নয়।
গত বছর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুতিদের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র গোষ্ঠীটির ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল। পরে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। সৌদি সূত্রগুলোর মতে, এবারও ওয়াশিংটন নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে জড়াতে খুব একটা আগ্রহী নয়।
সৌদি যুবরাজ শুরুতে ট্রাম্পের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সরাসরি হামলায় সম্মতি দেননি। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়।
পরে ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা বললেও ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত বড় কোনো সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারেন তিনি।
এতে রিয়াদের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যেখানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পাশে দাঁড়াবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
অসম যুদ্ধে সৌদি আরবের ঝুঁকি বেশি
হুতিদের তুলনায় সৌদি আরবের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অনেক বড়। গোষ্ঠীটির হাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও সৌদি আরবের রয়েছে বিস্তৃত তেল অবকাঠামো, বিমানবন্দর, বন্দর, পর্যটন প্রকল্প ও বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ। ফলে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বেশি।
সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, হুতিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানেই।
তার ভাষায়, সৌদি অবকাঠামোর মূল্য হুতিদের অবকাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি। তাই হামলায় সৌদি আরবের ক্ষতির সম্ভাবনাও অনেক বড়।
এটি মূলত অসম এক যুদ্ধ। তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হুতিরা সৌদি আরবকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করতে পারে। আর কোনো হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে আরও বেশি।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন। বড় কোনো প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের আগে সম্ভাব্য মুনাফার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনা করেন বিনিয়োগকারীরা। রিয়াদের বিমানবন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা হামলার শিকার হলে নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০১৯ সালের হামলার স্মৃতি
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলায় দেশটির তেল উৎপাদন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। এতে সাময়িকভাবে বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে।
সেই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, বিশাল সামরিক বাজেট ও আধুনিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্র দিয়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলা সম্ভব।
২০১৫ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর সৌদি আরব দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। এরপর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে লড়াই অনেকটাই কমে এলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শান্তিপ্রক্রিয়া আবার ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০২৩ সালের শান্তি পরিকল্পনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান সংকটের পেছনে ২০২৩ সালের সৌদি-সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনারও গুরুত্ব রয়েছে। ওই পরিকল্পনায় হুতিদের রাজনৈতিক বৈধতার দিকে এগোনোর সুযোগ এবং ইয়েমেন পুনর্গঠনে অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধ ও পুনর্গঠনে সহায়তার প্রতিশ্রুতির দিকেও এগোচ্ছিল সৌদি আরব।
কিন্তু লোহিত সাগরে নতুন করে সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠতা সেই শান্তিপ্রক্রিয়াকে কার্যত থামিয়ে দিয়েছে।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, পরিস্থিতি এখন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার আশঙ্কা, ২০১৫ সালের যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ সংঘাত শুরু হতে পারে। এবার লড়াই আরও রক্তক্ষয়ী হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব আগের তুলনায় কম মিত্র নিয়ে এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
বাব এল-মান্দেব থেকে হরমুজ
সংকটটির ভৌগোলিক গুরুত্বও কম নয়। ইয়েমেনের কাছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালির কাছে রয়েছে ইরান।
অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছে ইরান এবং বাব এল-মান্দেবের কাছে হুতিদের অবস্থান জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলাকে শুধু সৌদি-ইয়েমেন সংঘাত হিসেবে দেখলে বৃহত্তর চিত্রটি স্পষ্ট হয় না। এর সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
সৌদি যুদ্ধ, নাকি উপসাগরীয় সংকট?
ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, হুতিরা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন।
তার মতে, এটি শুধু সৌদি আরবের যুদ্ধ নয়; এটি একটি উপসাগরীয় যুদ্ধ।
হুতিদের হামলা বাড়লে সৌদি আরবের ওপর পালটা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপও বাড়বে। রিয়াদ জবাব দিলে ইরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কতটা জড়াবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি— নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ আরও ঝুঁকিতে পড়বে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের তুলনায় হারানোর মতো সম্পদ কম থাকায় হুতিরা দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরির কৌশল নিতে পারে। তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে হামলা কিংবা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আয়োজন বিঘ্নিত করার মাধ্যমে তারা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দুর্বল দিকটি সামনে আনতে চাইছে।
ফলে মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে সমীকরণটি কঠিন হয়ে উঠেছে। হুতিদের সঙ্গে সমঝোতা করলে ইয়েমেনে তার প্রতিপক্ষের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে; আর সামরিক অভিযান বাড়ালে ঝুঁকিতে পড়বে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার নিশ্চয়তাও পুরোপুরি নেই।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের চাপ শুধু ইয়েমেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎই নয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স অবলম্বনে
source: Rajneete







