News

রাশিয়াকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প, ‘বেঁচে যাচ্ছে’ চীন-ভারতও

রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে কংগ্রেসে ব্যাপক দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঠিক আগেই তা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক নির্বাহী আদেশে তিনি জানান, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থে’ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা প্রয়োজন।

অথচ কংগ্রেসে পাস হওয়ার পর এই আইনে ট্রাম্প নিজেই গত মাসে সই করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হয়েছিল। সেই আইনে রাশিয়ার কর্মকর্তা, ব্যাংক ও তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি চীন, ভারতের মতো রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করা হয়েছিল।

আইন অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবরের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা অথবা তা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল ট্রাম্পের। সেই সময়সীমার মাত্র দুই দিন আগে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) তিনি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এর ফলে রাশিয়া নিজে তো বটেই, চীন-ভারতের মতো দেশগুলোও মার্কিন শুল্কের হুমকি থেকে নিস্তার পেল।

নতুন এই পদক্ষেপে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কারণ, একদিকে ওয়াশিংটন কিয়েভকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থন দিয়ে আসছে, অন্যদিকে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে সমঝোতা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছেন।

রাশিয়াকে চাপে ফেলার আইন স্থগিত, স্বস্তি চীন-ভারতেও

‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামে পরিচিত আইনটির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তার মৃত্যুর পর কংগ্রেসে বিরল দ্বিদলীয় সমর্থনে আইনটি পাস হয়।

এ আইনের উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাশিয়া যে বিপুল অর্থ ও জ্বালানি আয় ব্যবহার করছে, সেটি কমিয়ে দেওয়া। এতে রুশ কর্মকর্তা ও ব্যাংকের পাশাপাশি তেল পরিবহনে ব্যবহৃত নিষেধাজ্ঞা এড়ানো ট্যাংকারের বহরকে লক্ষ্য করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল বা গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।

আইনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পাঁচ রুশ তেল বা গ্যাস আমদানিকারকের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছিল। তবে যেসব দেশ রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং আমদানি কমানোর জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ আইনটি শুধু রাশিয়াকে নয়, রাশিয়ার জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে বড়ভাবে যুক্ত অন্য দেশগুলোকেও চাপের মধ্যে ফেলার জন্য তৈরি হয়েছিল।

রাশিয়ার তেল বা গ্যাস আমদানির তালিকায় শীর্ষে ছিল চীন, ভারত, আজারবাইজান, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলে মার্কিন বাজারে এসব দেশের পণ্যেও শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হতো। নিষেধাজ্ঞার আইন পাস হওয়ার পর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চীন ও ভারত উদ্বেগও জানিয়েছিল।

চীন বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি ছাড়া কোনো দেশের ওপর এমন ‘দূরপ্রসারী এখতিয়ার’ চাপিয়ে দেওয়ার তারা বিরোধী। ভারতও সতর্ক করেছিল, নতুন শুল্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও ভারতের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে এখন এসব নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক স্থগিত থাকছে। আদেশে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বা তার শীর্ষ কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে ‘আরও পদক্ষেপ উপযুক্ত’ মনে না করা পর্যন্ত এই অব্যাহতি কার্যকর থাকবে। ফলে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা স্থগিতে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ চীন ও ভারতের জন্যও স্বস্তি হয়ে এসেছে।

কেন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের আদেশে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের কারণ হিসেবে ‘জাতীয় স্বার্থে’র কথা বলা হলেও হোয়াইট হাউজ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। কংগ্রেসে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, যা আগামী ৩ নভেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে।

এ নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের দুই কক্ষেই অল্প ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও বিশেষ করে ডিজেলের দাম নিয়ে চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরাও বলছেন, রাশিয়ার সঙ্গে নমনীয় হয়ে তেলের বাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলে নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের দলের পক্ষে যেতে পারে। সে কারণেই রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে।

ট্রাম্প এর মধ্যে গত সপ্তাহেই রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন। তার দাবি, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করবে, যার ফলে জ্বালানির দাম কমতে পারে। এই চুক্তির পর থেকেই তিনি রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েন। কারণ রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনার অর্থ শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মস্কোর অর্থনীতিতেই প্রবাহিত হবে— এমন অভিযোগ উঠেছে।

পুতিনের সঙ্গে ডিজেল চুক্তির পরই নতুন সিদ্ধান্ত

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তটি এসেছে ট্রাম্পের ঘোষিত ডিজেল চুক্তির মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে। ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন সরবরাহের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও প্রায় ৩০ লাখ টন সরবরাহের কথাও ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন।

রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনার এ সিদ্ধান্তে শুধু ডেমোক্র্যাটরাই নয়, কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও আপত্তি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ছয় রিপাবলিকানসহ মোট এক ডজন মার্কিন সিনেটর ট্রাম্পকে চিঠি দিয়ে ডিজেল চুক্তি বাতিল করার আহ্বান জানান। একই চিঠিতে তারা গত মাসে পাস হওয়া রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করারও দাবি করেন। তাদের যুক্তি, রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনলে মস্কোর হাতে এমন অর্থ যাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে ব্যবহার করা হতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। শুক্রবার ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে রাশিয়ায় আবার অর্থ প্রবাহিত হতে শুরু করবে।

কংগ্রেসে ক্ষোভ

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারাও। আইনটির অন্যতম উদ্যোক্তা সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের প্রতিনিধিদের এবং ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা থেকে এই অব্যাহতির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক নেই; বরং এটি পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের নমনীয়তার প্রকাশ।

ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডন বেয়ারও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, কংগ্রেসের তৈরি আইনকে এমনভাবে স্থগিত করার সুযোগ বন্ধ করতে আইনটি সংশোধন করা প্রয়োজন, যেন ট্রাম্প রাশিয়ার প্রতি নতি স্বীকার করতে না পারেন এবং ইউক্রেনকে যথাযথভাবে সমর্থন করা যায়।

তবে আইনটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ছিল— এটি শুধু ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগ ছিল না। লিন্ডসে গ্রাহামের নেতৃত্বে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই এতে সমর্থন দিয়েছিলেন।

লিন্ডসে গ্রাহামের উত্তরাধিকারে ধাক্কা

নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনটি লিন্ডসে গ্রাহামের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত গ্রাহাম জুলাইয়ে আকস্মিকভাবে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি ইউক্রেন সফর করেছিলেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে দীর্ঘদিন প্রচার চালিয়েছিলেন।

গ্রাহামের মৃত্যুর পর কংগ্রেসে আইনটি ব্যাপক সমর্থন পায়। ট্রাম্পও এতে সই করেন। গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার বোন ডারলিন গ্রাহাম তার সিনেট আসনের বাকি সময়ের জন্য দায়িত্ব নেন এবং এখন পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ট্রাম্প তাকে সমর্থনও করছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আইন তার নির্বাচনি প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল।

সম্প্রতি এক বিতর্কে ডারলিন গ্রাহাম আইনটি পাস হওয়ায় গর্ব প্রকাশ করলেও বলেন, আইনটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে— সেটি প্রেসিডেন্টের এখতিয়ার। তার যুক্তি ছিল, আইনটি প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার একটি হাতিয়ার দিয়েছে। সেটি ব্যবহার করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের।

কিন্তু এখন ট্রাম্প সেই হাতিয়ার প্রয়োগ না করে উল্টো নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন।

ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্প-জেলেনস্কি দ্বন্দ্বও বাড়ছে

নতুন সিদ্ধান্তটি এমন একসময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্পর্কও আবার তীব্র টানাপোড়েনে। ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য পুতিনের সঙ্গে সমঝোতায় না পৌঁছানোর দায়ও জেলেনস্কির ওপর দিচ্ছেন। এমনকি ইউক্রেনের নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প আরও একটি আকস্মিক ঘোষণা দেন— রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অন্যের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে মূলত ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলার বিষয়টি সামনে আসে। তিনি দাবি করেন, এসব হামলা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কিয়েভ এ অবস্থান নিয়ে অসন্তুষ্ট। ইউক্রেনের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা তাদের সামরিক কৌশলের অংশ এবং মস্কোও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে আসছে। এ অবস্থায় রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ইউক্রেনের জন্য আরও একটি অস্বস্তিকর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, এপি, এএফপি

source: Rajneete

Back to top button