প্রতিবাদের ঠিকানা যন্তর মন্তর, ২৩ বছর পর তালিকা থেকে বাদ

আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে কুস্তিগিরদের অবস্থান, কৃষক আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ— দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল যন্তর মন্তর। শুরুটা ছিল ২০০৩ সালে। এরপর ২৩ বছর ধরে ‘যন্তর মন্তর’ বললেই আর এর বাড়তি কোনো পরিচিতি দরকার হতো না। এবার সেই যন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হলো প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা তিন দিন বিক্ষোভের পর এসেছে এমন সিদ্ধান্ত। সোমবার (১২ অক্টোবর) ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সে সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ফের সামনে এসেছে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে বিক্ষোভ ও সমাবেশের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকবে তিনটি— মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি গ্রাউন্ড ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান সংসদ ভবন থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। বুরারি গ্রাউন্ডের দূরত্ব প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার এবং সিবিডি গ্রাউন্ড প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে।
দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের সই করা আদেশে বলা হয়েছে, প্রতিবাদের বিকল্প স্থান নির্ধারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই যন্তর মন্তরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বিকল্প প্রতিবাদস্থল নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনা।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) গত ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে গণপরিবহনে বিধিনিষেধের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, যন্তর মন্তরের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প জায়গা খোঁজা যেতে পারে। এমন একটি স্থান প্রয়োজন, যেখানে প্রতিবাদকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হতে পারবেন এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও পাবেন। এর দুদিন পরই এলো ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
বোট ক্লাব থেকে যন্তর মন্তর
যন্তর মন্তরের আগে নয়াদিল্লিতে প্রতিবাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইন্ডিয়া গেটের কাছে বোট ক্লাব এলাকা। ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাবেশ ও আন্দোলনের জন্য জায়গাটি এতটাই পরিচিত ছিল যে এর নাম হয়ে উঠেছিল ‘রেজিস্ট্যান্স স্কয়ার’।
১৯৮৮ সালের অক্টোবরে ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে বিশাল কৃষক আন্দোলন সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদ্যুতের মাশুল ও আখের দামসহ বিভিন্ন দাবিতে প্রায় পাঁচ লাখ কৃষক দিল্লির বোট ক্লাব ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হন। এতে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকার কৃষকদের দাবির বিষয়ে আশ্বাস দেওয়ার পর আন্দোলন শেষ হয়।
এরপর সরকার নিরাপত্তার যুক্তিতে বোট ক্লাব এলাকায় বিক্ষোভ সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটিকে বড় সমাবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। ধীরে ধীরে প্রতিবাদস্থল হিসেবে জায়গা করে নিতে থাকে যন্তর মন্তর। ২০০৩ সালে জায়গাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদস্থল ঘোষণা করা হয়। তবে সেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মানুষের জমায়েতের সীমা নির্ধারণ এবং আয়োজকদের যানবাহন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
-43bf68.jpg)
আন্না হাজারের আন্দোলন দিয়ে জাতীয় আলোচনায়
যন্তর মন্তরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আন্দোলনগুলোর একটি ছিল ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। সমাজকর্মী আন্না হাজারে সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি তদন্তের জন্য শক্তিশালী জন লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে ওই বছরের এপ্রিলে অনশন শুরু করেন।
দ্রুতই আন্দোলনটি দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল, শান্তি ভূষণ, প্রশান্ত ভূষণ, কিরণ বেদি, রাম জেঠমালানি ও মেধা পাটকরের মতো পরিচিত ব্যক্তিরা আন্দোলনে যুক্ত হন। জনসমাগম পাঁচ হাজারের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে আন্দোলন স্থানান্তর করা হয় রামলীলা ময়দানে। কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ খসড়া কমিটি গঠনে সম্মত হয়। পরে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকেই ২০১২ সালে আম আদমি পার্টির জন্ম হয়। দলটি পরের বছর দিল্লিতে সরকার গঠন করে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে চলন্ত বাসে ২৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় রাজধানী জুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। নারী নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতার বিচার ও কঠোর আইনের দাবিতে তরুণ-তরুণীদের অন্যতম জমায়েতস্থল হয়ে ওঠে যন্তর মন্তর। ওই আন্দোলনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালে ভারতের যৌন অপরাধসংক্রান্ত আইন সংশোধন করা হয়।
কৃষক, সেনা ও কুস্তিগিরদের প্রতিবাদ
২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বা এক পদে এক পেনশন বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে নামেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা। একই পদমর্যাদা ও চাকরির মেয়াদের জন্য অবসরের সময় নির্বিশেষে সমান পেনশন নিশ্চিত করার দাবিতে ভারতীয় সাবেক সেনাসদস্য আন্দোলনের ব্যানারে অনশন শুরু হয়।
২০১৭ সালে তামিলনাড়ুর কৃষকেরা রাজ্যের দীর্ঘ খরার পর কৃষিসংকটের দিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যন্তর মন্তরে শতাধিক দিন অবস্থান করেন। পি আয়্যাকান্নুর নেতৃত্বে আন্দোলনকারীরা কৃষিঋণ, ক্ষতিপূরণ ও কৃষকদের দুরবস্থা নিয়ে প্রতিবাদ জানান।
২০১৯ ও ২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে আন্দোলনের সময়ও যন্তর মন্তর প্রতিবাদকারীদের সমাবেশস্থল ছিল।
২০২৩ সালে ভারতের অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগিরেরা প্রায় এক মাস সেখানে অবস্থান করেন। ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি ও বিজেপি সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ভিনেশ ফোগত, সাক্ষী মালিক ও বজরং পুনিয়ারা। অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন ব্রিজভূষণ। এই আন্দোলন ক্রীড়াঙ্গনে যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত ও ক্রীড়া প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে জাতীয় বিতর্ক তৈরি করে।
-9e01cd.jpg)
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ও নতুন বিতর্ক
২০২৬ সালের নিট-ইউজি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরেও যন্তর মন্তরে আন্দোলন হয়। সিজেপি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে কর্মসূচি শুরু করে। পরে জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন। আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়।
নতুন করে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামে পরিচিত এই আন্দোলনের সময় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, সড়কে ব্যারিকেড ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার কারণে প্রতিবাদকারীদের জমায়েত বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের কেউ কেউ কনট প্লেস ও দিল্লি হাটের মতো অন্য এলাকায় চলে যান।
-d5b7d8.jpg)
প্রতিবাদের অধিকার বনাম জনস্বার্থ
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় পরিবেশ আদালত স্থানীয় বাসিন্দাদের শব্দদূষণ, আবর্জনা ও দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্নের অভিযোগের পর যন্তর মন্তর রোডে বিক্ষোভ, জনসভা ও মাইক্রোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রতিবাদকারীদের রামলীলা ময়দানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
পরে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর আবেদনে সুপ্রিম কোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে আদালত জানায়, যন্তর মন্তরে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকারকে কার্যত নাকচ করার শামিল।
আদালত নির্দেশ দেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্তিতে থাকার অধিকার এবং প্রতিবাদকারীদের মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। এ জন্য জনসমাগমের সংখ্যা, সময় ও অন্যান্য বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে, কিন্তু ‘blanket ban’ বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ নেই।
এবার যন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় সেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। বিকল্প জায়গায় প্রতিবাদ সরিয়ে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছাকাছি প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ কমে গেলে আন্দোলনকারীদের দৃশ্যমানতা এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর জনচাপ তৈরির সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে যন্তর মন্তর যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী, নতুন সিদ্ধান্তের পর সেই ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় কোথায় লেখা হবে— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: দ্য প্রিন্ট, ফার্স্ট পোস্ট জার্নাল, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস
source: Rajneete







