ট্রাম্পের গাজা কূটনীতিকে ‘লজ্জার প্রদর্শনী’ বলে জাতিসংঘে নিন্দা ম্যাক্রোঁর

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, শান্তির ঘোষণা দেওয়া হলেও উপত্যকাটিতে একটি মানবিক করিডরও পুনরায় চালু করা হয়নি। এ পরিস্থিতিকে তিনি সবার জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একই মঞ্চে ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর বক্তব্য দেন ম্যাক্রোঁ। এ সময় গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার জন্য ট্রাম্পের সমালোচনা করেন তিনি। আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়তে যাওয়া ম্যাক্রোঁর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটিই শেষ ভাষণ। খবর রয়টার্সের।
ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, বিশ্ব এমন একটি পরিস্থিতি দেখছে, যা সবার জন্য লজ্জার হওয়া উচিত। এর আগে ট্রাম্প তার গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “এক বছর আগে এই একই হলে প্রায় এক ডজন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমি কিছু মানুষের কটাক্ষ শুনতে পাই— ‘স্বীকৃতি তো কেবল একটি কাগজের টুকরো, বাস্তবতার দিকে তাকান।’” এ কথা বলার সময় জাতিসংঘে নিজের শেষ ভাষণে তিনি মঞ্চে মুষ্টি ঠোকেন।
‘কিন্তু গাজার পরিস্থিতির সামনে আমরা যদি নিষ্ক্রিয়ই থাকি, তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়? কেউ কেউ কথিত শান্তির কথা বলে গর্ব করছেন। কিন্তু সেই শান্তি এক সেকেন্ডের জন্যও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়নি। আমরা কি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখব, যা আমাদের সবার জন্য লজ্জার হওয়া উচিত?’— যোগ করেন তিনি।
হোয়াইট হাউজের জবাব
ম্যাক্রোঁর সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছেন, নিহত জিম্মিদের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং এখন গাজায় শান্তির জন্য ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে আনা কেলি আরও বলেন, ‘অন্যরা যখন শুধু কথা বলছে, তখন প্রেসিডেন্ট জটিল এই সমস্যার সরাসরি মোকাবিলা করেছেন। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আর কেউ তার চেয়ে বেশি কিছু করেননি।’
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে ফ্রান্সের কিছু রাজনীতিক ও অধিকারকর্মীর সমালোচনার মুখে পড়েছেন ম্যাক্রোঁ। তাদের অভিযোগ, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও এ বিষয়ে ম্যাক্রোঁর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
তবে একই সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে প্যারিস। ফ্রান্স কিছু জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং দখল করা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে আসা পণ্য নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘পশ্চিম তীরে কী ঘটছে, সেদিকে তাকান। সেখানে প্রতিদিনই লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। কার নামে এসব করা হচ্ছে? হামাস কখনো পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে যা ঘটছে, তাতে প্রতিদিন এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অসম্ভব করে তোলা হচ্ছে, যে প্রকল্পের ভিত্তি হওয়া উচিত ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্বের বৈধ অধিকারকে সম্মান করা।’
গত এক বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক বিশেষভাবে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ম্যাক্রোঁ বলেন, ইসরায়েলের সব প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলেই দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে— এমন ধারণা ভুল।
তিনি বলেন, ‘তারা আজ এবং ভবিষ্যতে— উভয় সময়েই ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।’
‘জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক’
ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে আর সাত মাস বাকি। ২০১৭ সালে প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার পর এবারই সেখানে ম্যাক্রোঁর শেষ উপস্থিতি।
কূটনীতির আনুষ্ঠানিকতা, জমকালো আয়োজন, প্রতীকী বিষয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে ম্যাক্রোঁর দক্ষতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সাফল্য অর্জনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বলেও তাদের কেউ কেউ মনে করেন।
তবে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা ও জাতিসংঘের তিনি সবসময়ই দৃঢ় সমর্থক। ম্যাক্রোঁ বিশ্ব জুড়ে ‘জঙ্গলের আইনে ফিরে যাওয়ার’ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, দেশগুলো এখন এমন এক বিশ্বের মধ্যে বেছে নেওয়ার অবস্থায় রয়েছে, যেখানে ক্ষমতা ও জবরদস্তি প্রাধান্য পাবে, অথবা এমন একটি ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’ থাকবে, যা নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন জাতিসংঘের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। কেউ কেউ যে দায়মুক্তির নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তা আমরা মেনে নিতে পারি না।’
ভাষণের শেষে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক!’
source: Rajneete







