News

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ঐক্যের ডাক ব্রিকসের, বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার বার্তা কতটা বাস্তব?

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই নিজেদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিলো ব্রিকস। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, একতরফা বাণিজ্যনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ১১ দেশের জোটটি। তবে দুই দিনের নয়াদিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকল— ব্রিকস কি সত্যিই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠছে, নাকি এটি এখনো ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর একটি সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম মাত্র?

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সম্মেলন শেষে গৃহীত ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশনে’ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সর্বোচ্চ সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বান জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে জড়িয়ে থাকা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একই ঘোষণায় সম্মত হওয়াকে এবারের সম্মেলনের বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি একতরফা নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার সমালোচনা এবং জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে আরও সরাসরি পশ্চিমের সমালোচনা করেন। তার দাবি, একতরফা নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের কল্যাণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তিনি ব্রিকস দেশগুলোকে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং পশ্চিমনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ব্রিকসকে আরও বড় কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও বলেছেন, মস্কো কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং পুরোনো-নতুন সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতিত্ব পাবে চীন।

তবে এখানেই ব্রিকসের বাস্তব সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। জোটটি অভিন্ন মুদ্রা চালু করেনি, ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তও নেয়নি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, সীমান্তপারের পেমেন্ট ব্যবস্থা উন্নত করা এবং আর্থিক সহযোগিতার প্রযুক্তিগত কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে— ব্রিকস যেন পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক জোটে পরিণত না হয়।

কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেসের মতে, ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি ঐক্য তৈরি করে, তার একটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের স্বার্থ বাড়ানো এবং পশ্চিমের নীতিগত ‘উপদেশ’ থেকে মুক্ত থাকা। তবে ব্রিকসের লক্ষ্য পশ্চিমা ব্যবস্থার জায়গা দখল করা নয়, বরং নিজেদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা।

একইভাবে সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহোর মতে, ব্রিকসের সাফল্যকে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং পশ্চিমা আধিপত্যের প্রয়োগকে কঠিন করে তোলাই এর বড় অর্জন হতে পারে।

এসব বিশ্লেষকদের অভিমত, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য পশ্চিমের বাইরে সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসের অস্তিত্বই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই জোটের পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরির কোনো জায়গাও নেই।

ভারতের বিশ্লেষক সি রাজা মোহনের মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, নয়াদিল্লি সম্মেলনের সাফল্য হলো ব্রিকসকে একটি আদর্শিক পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত না করে বাস্তব সহযোগিতার জায়গায় রাখা। তার ভাষায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা নয়, সংস্কার করা।

এই সীমাবদ্ধতাই ব্রিকসের ভবিষ্যতের মূল প্রশ্ন। সদস্যদের মধ্যে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তা-স্বার্থ ভিন্ন, আবার ভারত নিজেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে রাজনৈতিক ঐক্য থাকলেও কৌশলগত অভিন্নতা এখনো তৈরি হয়নি।

তবু ইরান যুদ্ধের মতো গভীর বিভাজনের সময়েও ১১ সদস্যকে একটি যৌথ ঘোষণায় আনাকে বড় একটি অর্জন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ব্রিকস হয়তো এখনই বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছে না, বরং পশ্চিমকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আরেকটি প্রভাবশালী কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পথে এগোচ্ছে।

দুই দিনের ব্রিকস সম্মেলনে যে যৌথ ঘোষণায় ১১ সদস্যদেশ একমত হয়েছে সেই ঐক্যকে বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে কতটা কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দেওয়া যায়— সেটিই ব্রিকসের নয়াদিল্লি সম্মেলনের আসল পরীক্ষা।

source: Rajneete

Back to top button