শেরপুরে আমন ধান রক্ষায় কৃষকদের ভরসা ‘বলন’ পদ্ধতি

বন্যার ক্ষতি থেকে আমন ধান রক্ষায় শেরপুরে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘বলন’ বা ডাবল ট্রান্সপ্লান্টেশন পদ্ধতি। কৃষকদের দাবি, এই পদ্ধতিতে চাষ করলে বন্যার পানিতে আমনের চারা তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চারা শক্ত ও সতেজ থাকায় ফলনও ভালো পাওয়া যায়। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়।
জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে প্রতিবছরই পানিতে তলিয়ে যায় শেরপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ক্ষেত। কোথাও দেখা যায় কোমরসমান পানি, আবার কোথাও পুরোপুরি ডুবে যায় ফসলের জমি। ফলে বন্যার সময় আমনের চারা রক্ষা করা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শেরপুর সদরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, শ্রীবরদীর সোমেশ্বরী, ঝিনাইগাতী মহারশি ও নালিতাবাড়ী চেল্লাখালি এবং ভোগাই নদীর পানি বাড়লেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় বন্যা। এতে পানিতে ডুবে যায় নিম্নাঞ্চলের আমনের চারা। এই অবস্থায় বন্যার ক্ষতি কমাতে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘বলন’ পদ্ধতি।
কৃষকরা জানান, এই পদ্ধতিতে প্রথমে বীজতলায় চারা উৎপাদন করা হয়। পরে সেই চারা তুলে দ্বিতীয় একটি বীজতলায় আবার রোপণ করা হয়। সেখানে কিছুদিন পরিচর্যার পর শক্ত ও পরিণত চারা মূল জমিতে রোপণ করা হয়। দ্বিতীয় বীজতলায় থাকার কারণে চারার কাণ্ড তুলনামূলক শক্ত হয় এবং শিকড়ও ভালোভাবে গড়ে ওঠে। ফলে বন্যার পানিতে জমি তলিয়ে গেলেও চারা সহজে নষ্ট হয় না। শুধু তাই নয়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা বেশি সবল হওয়ায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়। এতে ধানের ফলনও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়।
‘বলন’ পদ্ধতি অনেক কৃষকের কাছে ‘গাইছি’ নামেও পরিচিত। কৃষকেরা বলছেন, দিন দিন এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ বাড়ছে। বিশেষ করে আমন চাষের শেষের দিকে বন্যাপ্রবণ ও নিম্নাঞ্চলের জমিতে এই পদ্ধতিতে চারা রোপণ করেন তারা। এতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আমনের আবাদ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
সদরের কামারেরচর এলাকার বাসিন্দা হাফিজ মিয়া বলেন, এই মৌসুমে একবারের বীজতলার চারা সরাসরি ক্ষেতে লাগাইলে পানি উঠলেই চারাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর বলন কইরা দুইবার চারা লাগাইলে গাছটা শক্ত হয়। পানি হইলেও সহজে নষ্ট হয় না। আমরা কয়েকবার থেকে এ পদ্ধতিতে চাষ করছি।
একই এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল মিয়া বলেন, আমাগো এদিকে প্রায়ই পাহাড়ি পানি আসে। আগের মতো একবারের চারা লাগাইলে অনেক সময় পানি উঠার পর চারা টেকে না। এখন বলন কইরা চারা লাগাই। গাছ শক্ত হয়, পানি নামার পরও ভালো থাকে। ফলনও ভালো পাই।
ঝিনাইগাতী এলাকার কৃষক রহমত আলী বলেন, আমগর এলাকায় কয়দিন পর পরই পাহাড়ি ঢল আহে, তহন আমরা আমাদের কষ্টের ফসলগুলা রক্ষা করবার পাই না। তাই এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষই বলন করে।
একই উপজেলার কৃষক রহমান মিয়া বলেন, আমরা এ পদ্ধতিতে আগেও করেছি। আমার বাপ-চাচারাও এ পদ্ধতি চাষ করেছে। আমরাও এখন সেইভাবেই করি। তবে, আগে কম আবাদ হয়েছে এ পদ্ধতি, এখন অনেক বেশি হইতাছে।
জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বন্যাপ্রবণ ও নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের জন্য ‘বলন’ পদ্ধতি কার্যকর একটি চাষাবাদ কৌশল। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা তুলনামূলক শক্ত হওয়ায় বন্যার পানিতে ক্ষতির ঝুঁকি কম থাকে। এই অঞ্চলের কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরেই আমন মৌসুমে এই পদ্ধতিতে চাষ করে আসছে। আমরাও কৃষকদের এই পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে শেরপুর জেলায় প্রায় ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে ‘বলন’ বা ডাবল ট্রান্সপ্লান্টেশন পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়েছে।
source: Asia Post







