আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরতে জাতিসংঘে নতুন বিশ্বমানচিত্রের প্রস্তাব

বিশ্বকে এতদিন যে মানচিত্রে দেখে আসা হয়েছে, তা কি পৃথিবীর দেশ ও মহাদেশগুলোর প্রকৃত আকারকে সঠিকভাবে তুলে ধরে? বিশেষ করে আফ্রিকাকে কি সেই মানচিত্রে তার প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক ছোট করে দেখানো হচ্ছে?
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এ প্রশ্ন সামনে রেখে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোট হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর। টোগোর উদ্যোগে আনা এই প্রস্তাবে বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রের ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করে এমন একটি বিশ্বমানচিত্র গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, যেখানে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন আরও নির্ভুলভাবে ফুটে ওঠে।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে জানিয়েছেন, প্রস্তাবটির পৃষ্ঠপোষক টোগো। আফ্রিকান ইউনিয়নের বাকি ৫৪টি সদস্যরাষ্ট্রও এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে মোট কতটি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে রয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি।
দুসের ভাষায়, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক আলোচনা। কারণ এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাই আমাদের সবাইকে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রস্তাবটি পাস হলে এর প্রভাব প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলের পাঠ্যক্রম, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি উপস্থাপনা এমনকি দৈনন্দিন ব্যবহৃত প্রযুক্তিতেও মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা দিতে পারে। কারণ শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক কাজে এখনো মার্কেটর প্রজেকশনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
কেন মার্কেটর মানচিত্র নিয়ে এত বিতর্ক?
ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে এই মানচিত্রের নকশা তৈরি করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে নাবিকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া। নৌ-পরিভ্রমণের জন্য এর বিশেষ সুবিধা থাকায় প্রায় পাঁচ শতাব্দী পরও মার্কেটর প্রজেকশন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পরিচিত মানচিত্রের ধরন হিসেবে টিকে আছে।
কিন্তু এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো— পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে তুলে ধরতে গিয়ে এটি বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন বিকৃত করে।
বিশেষ করে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলোকে প্রকৃত আকারের তুলনায় ছোট দেখায়, আর উত্তর ও দক্ষিণের উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলোকে অনেক বড় দেখায়।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। মার্কেটর মানচিত্রে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের বলে মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
আফ্রিকার বিশালত্ব বোঝাতে #CorrectTheMap প্রচারণার একটি Change.org আবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার ভূখণ্ডের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের বড় একটি অংশকে একসঙ্গে রাখা সম্ভব— তারপরও কিছু জায়গা অবশিষ্ট থাকবে। ওই আবেদনে এরই মধ্যে ১১ হাজারের বেশি মানুষ সই করেছেন।

মানচিত্রের বিকৃতি থেকে ‘কার্টোগ্রাফিক উপনিবেশবাদ’
বিতর্কটি শুধু ভৌগোলিক নির্ভুলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদেরা বহু বছর ধরে বলে আসছেন, মার্কেটর প্রজেকশনের এই বিকৃতি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমালোচকেরা মনে করেন, মানচিত্রে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে তাদের প্রকৃত আয়তনের তুলনায় বড় এবং বিষুবীয় অঞ্চলকে ছোট করে দেখানোর ফলে বিশ্বের ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কেও মানুষের মধ্যে একটি অবচেতন ধারণা তৈরি হতে পারে।
এই সমালোচনা থেকে ‘কার্টোগ্রাফিক কলোনিয়ালিজম’ বা ‘মানচিত্রগত উপনিবেশবাদ’ শব্দটিরও প্রচলন হয়েছে। অ্যাক্টিভিস্টদের যুক্তি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত এই মানচিত্র বিশ্ব দক্ষিণের ভৌত উপস্থিতিকে দৃশ্যত সংকুচিত করেছে এবং উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোর আকারকে বাড়িয়ে তুলেছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং শিক্ষাব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পক্ষপাত তৈরি ও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ হয়েছে। অর্থাৎ, একটি মানচিত্র মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখে— তার ওপরও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
পিটার্সের বিকল্প মানচিত্র থেকে ‘ইকুয়াল আর্থ’
মার্কেটর প্রজেকশনের সবচেয়ে পরিচিত সমালোচকদের একজন ছিলেন জার্মান ইতিহাসবিদ আর্নো পিটার্স। ১৯৭৩ সালে তিনি গল-পিটার্স প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব বিশ্বমানচিত্র তৈরি করেন। পরে এটি মার্কেটর মানচিত্রের একটি বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে টোগোর বর্তমান #CorrectTheMap প্রচারণা গল-পিটার্স মানচিত্রের বদলে আরও নতুন একটি নকশাকে সামনে আনছে— ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র।
আন্তর্জাতিক একদল মানচিত্রবিদ এই নকশাটি তৈরি করেন। এটি ‘ইকুয়াল-এরিয়া প্রজেকশন’ অনুযায়ী তৈরি হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পারস্পরিক আয়তনের সম্পর্ককে মার্কেটরের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে তুলে ধরে।
সমর্থকরা বলছেন, ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র গ্রহণ করলে আফ্রিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা বদলাতে সাহায্য করবে এবং বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থাকে উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হবে।
আফ্রিকার বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এই উদ্যোগের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই সবচেয়ে বেশি। আফ্রিকা শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ নয়; জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ, জ্বালানি, কৃষি, সমুদ্রপথ ও ভবিষ্যৎ বাজারের দিক থেকেও মহাদেশটির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অথচ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জে জে এনকও মনে করেন, মার্কেটর প্রজেকশন দৃশ্যত আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে ছোট করে দেখিয়েছে। তার মতে, #CorrectTheMap প্রচারণা আফ্রিকান দেশগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও বেশি প্রভাব এবং নিজেদের মহাদেশকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার অংশ।
এনকও বলেন, সমান-আয়তনের একটি মানচিত্র গ্রহণ করলে শিক্ষা ও জনসাধারণের বোঝাপড়ার জন্য আরও নির্ভুল ভিত্তি তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি একটি বার্তাও দেবে— আফ্রিকার জনমিতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আর পুরোনো ও বিকৃত ধারণার মাধ্যমে দেখা উচিত নয়।
অর্থাৎ, মানচিত্র পরিবর্তনের এই উদ্যোগকে আফ্রিকার বৈশ্বিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব পুনর্নির্ধারণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দাস বাণিজ্য নিয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের পর নতুন উদ্যোগ
টোগোর কর্মকর্তারা আশা করছেন, মানচিত্র নিয়ে প্রস্তাবটিও এ বছর জাতিসংঘে পাস হওয়া আরেকটি আফ্রিকান ইউনিয়ন-সমর্থিত প্রস্তাবের মতো সাফল্য পাবে। গত মার্চে ঘানার উদ্যোগে আনা একটি প্রস্তাবে দাস বাণিজ্যকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করার আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সেটি ১২৩ ভোটে পাস হয়। বিপক্ষে ভোট দেয় তিনটি দেশ এবং ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
ঘানার ওই সাফল্য টোগোর কর্মকর্তাদের আশাবাদী করেছে। তাদের ধারণা, আফ্রিকার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এ ধরনের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করা সম্ভব।
ভোট পাস হলে কী হবে?
জাতিসংঘের প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক না হলেও টোগো এরই মধ্যে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। টোগোর রাজধানী লোমেতে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইউনেস্কো, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও গুগল ম্যাপসের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে জাতিসংঘের প্রস্তাব পাস হলে কীভাবে নতুন মানচিত্রটি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
এর অর্থ— বিষয়টি শুধু জাতিসংঘের একটি প্রতীকী ভোটে শেষ করার পরিকল্পনা নেই। বরং স্কুলের শ্রেণিকক্ষ থেকে ডিজিটাল ম্যাপিং সেবা পর্যন্ত বিশ্বকে যে মানচিত্রে দেখানো হয়, সেখানে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে।
এই উদ্যোগের সময় নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের উদ্দেশে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুসের পালটা প্রশ্ন। ‘যারা বলেন এখন কেন, আমি বলি— কেন নয়?’ তার মতে, বিশ্বকে যে মানচিত্রের মাধ্যমে এতদিন দেখা হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের সময় এসেছে।
দুসে বলেন, ‘আমরা যখন বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকাই… তখন বয়ান বা আখ্যান পরিবর্তনের সময় এসেছে।’ এ উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট করে তিনি আরও বলেন, ‘আফ্রিকায় আমাদের নিজেদের যে বিষয়গুলো পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে, সেগুলো পরিবর্তনের দায়িত্ব এখন আমাদেরই নিতে হবে।’
ফলে শুক্রবারের ভোটটি বাস্তবে কোনো দেশের সীমান্ত পরিবর্তন করবে না, বদলে দেবে না কোনো ভূখণ্ডের আয়তনও। কিন্তু এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বড়। শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত একটি মানচিত্রের পরিবর্তনের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে আফ্রিকা মূলত আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলছে— বিশ্বকে কে কীভাবে দেখাবে, আর সেই দেখানোর ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?
এই অর্থে #CorrectTheMap শুধু মানচিত্র সংশোধনের প্রচারণা নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব ও উপনিবেশিক উত্তরাধিকারের একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো নিয়েও আফ্রিকার নতুন করে প্রশ্ন তোলার উদ্যোগ।
source: Rajneete







