নাক ঝাড়া থেকে তেলাপোকার দুধ নিয়ে গবেষণা, এবারের ইগ নোবেলে যত চমক

বিজ্ঞানের গবেষণা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গবেষণাগার, সাদা অ্যাপ্রন, অণুবীক্ষণযন্ত্র কিংবা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ছবি। তবে বিজ্ঞানীরা যে সব সময় এমন প্রচলিত বিষয় নিয়েই গবেষণা করেন, তা নয়। অনেক সময় আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত বা হাস্যকর বিষয় নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়।
এমনই ব্যতিক্রমী গবেষণাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে ২০২৬ সালের ইগ নোবেল পুরস্কার। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অনুষ্ঠিত হয়েছে পুরস্কারটির ৩৬তম আসর। এবারের অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ছিল ছত্রাক।
ইগ নোবেল পুরস্কার মূলত নোবেল পুরস্কারের ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ হিসেবে পরিচিত। ‘অ্যানালস অব ইমপ্রোবেবল রিসার্চ’ সাময়িকী প্রতিবছর এ পুরস্কারের আয়োজন করে। আয়োজকদের ভাষায়, এমন গবেষণাকেই এখানে সম্মান জানানো হয়, যা ‘প্রথমে মানুষকে হাসায়, পরে ভাবতে বাধ্য করে।’
অনুষ্ঠানে এবারও ছিল কাগজের উড়োজাহাজ ছোড়ার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। পাশাপাশি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা মাশরুমের পোশাক পরে ছত্রাক নিয়ে নতুন একটি অপেরার গান পরিবেশন করেন।
এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে ‘কীভাবে নাক ঝাড়তে হয়—নাক ঝাড়ার বায়ুগতিবিদ্যার গবেষণা’ শীর্ষক একটি গবেষণা।
অন্যদিকে, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে এমন একটি গবেষণা, যেখানে প্রস্রাবের পাত্রে তরল ছিটকে পড়া ঠেকানোর উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।
জীববিজ্ঞানের পরিবর্তে এবার যান্ত্রিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও ছিল চমক। মশার শুঁড়কে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণের মুখ হিসেবে ব্যবহার করার একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে পুরস্কার পেয়েছেন গবেষকেরা। গবেষকেরা এ প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন ‘নেক্রোপ্রিন্টিং’।
কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ওই গবেষণার সহলেখক চ্যাংহং কাও বলেন, ইগ নোবেল পুরস্কার তাদের মতো গবেষকদের অনুসন্ধানী চিন্তাভাবনাকে স্বীকৃতি দিতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, কেউই পরিকল্পনা করে মশার মুখ দিয়ে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণের মুখ তৈরি করতে বসেননি। এমন একটি বিষয়কে খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে আমরা সেখানে পৌঁছেছি, যেটিকে শুরুতে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল।
অর্থনীতি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে এমন একটি গবেষণা, যেখানে দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ শিশুদের মিষ্টির বাক্স থেকে মিষ্টি নিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য অনৈতিক আচরণে তুলনামূলকভাবে বেশি জড়াতে পারেন।
রসায়ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে আরেকটি চমকপ্রদ গবেষণা। সেখানে দেখা গেছে, তেলাপোকার দুধে গরুর দুধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি রয়েছে।
এ ছাড়া চুম্বনের বিবর্তনীয় ইতিহাস নিয়ে করা একটি গবেষণাও পুরস্কার পেয়েছে। গবেষণাটির সহলেখক এবং ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিজ্ঞানী মাতিল্ডা ব্রিন্ডল বলেন, বিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বাণিজ্যিক শিল্প বা প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই—এমন গবেষণার গুরুত্বও ক্রমেই কম করে দেখা হচ্ছে।
তার মতে, প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে চারপাশের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে ‘কেন’—এই প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিলে বিজ্ঞানের জন্য তা বড় ক্ষতি হবে। কৌতূহল থেকেই জ্ঞান অনুসন্ধান করা বিজ্ঞানের অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের লেনোয়ার-রাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কার্লি অ্যান ইয়র্ক, যিনি পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বলেন—ইগ নোবেল পুরস্কার বরাবরই এমন গবেষণাকে সামনে আনে, যা মানুষকে প্রথমে হাসায় এবং পরে ভাবায়।
তিনি বলেন, এবারের বিজয়ীদের মধ্যে মাটিবিজ্ঞান নিয়ে নোংরা অন্তর্বাসের গবেষণা থেকে শুরু করে মশার ত্রিমাত্রিক মডেল—সবই এমন ধারণা, যা প্রথমে অবাস্তব মনে হলেও শেষ পর্যন্ত বৈধ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরিণত হয়েছে।
ইয়র্কের মতে, কোনো গবেষণাকে শুরুতে তুচ্ছ মনে হলেও মৌলিক গবেষণা থেকেই ভবিষ্যতে বড় আবিষ্কার হতে পারে। এমনকি মশার মুখের ত্রিমাত্রিক মডেল ভবিষ্যতে ব্যথাহীনভাবে ওষুধ শরীরে পৌঁছে দেওয়ার নতুন পদ্ধতির ধারণাও দিতে পারে।
তার ভাষায়, বিষয়টি যতই হাস্যকর মনে হোক না কেন, জ্ঞান অর্জনের কোনো প্রচেষ্টাই আসলে তুচ্ছ নয়।
source: Asia Post







