নাইন-ইলেভেনকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ না বলতে সিবিসির নির্দেশ নিয়ে বিতর্ক

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (নাইন-ইলেভেন) হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রতিবেদন তৈরির সময় ‘সন্ত্রাস’ শব্দটি ব্যবহার না করতে সাংবাদিকদের নির্দেশ দিয়েছে কানাডার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন কানাডার নাগরিক।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মার্কিন ম্যাগাজিন-সংবাদমাধ্যম ফোর্বসের খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সিবিসির জনসংযোগবিষয়ক পরিচালক কেরি কেলি জানান, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দ ব্যবহারের আগে তাদের নীতিমালা অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কোনো সূত্র বা সাক্ষাৎকারদাতা এসব শব্দ ব্যবহার করলে তার বক্তব্যের সূত্র উল্লেখ করে শব্দগুলো ব্যবহার করাই সিবিসির পছন্দ।

সম্প্রতি কানাডা আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম টরন্টো সানের এক কলামিস্টের প্রতিবেদনের পর সিবিসি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সিবিসির সাংবাদিকদের একটি স্মারক পাঠিয়ে বলা হয়েছিল, ‘১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করবেন না।’
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য ভিকি পালাদিনো কানাডার এই সম্প্রচারমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেছেন, হামলায় নিহত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সিবিসি অবহেলা দেখাচ্ছে এবং ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর মতো ভাষা ব্যবহার করছে।
এ বছর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বিবেচিত এই ঘটনা।

সেদিন আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করেন। এর মধ্যে দুটি নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের সুউচ্চ জোড়া ভবন টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। আরেকটি বিমান আছড়ে পড়ে পেন্টাগনে। চতুর্থটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এসব হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হন।
নাইন-ইলেভেনকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ না বলতে সাংবাদিকদের দেওয়া সিবিসির নির্দেশনাকে ‘স্পষ্টতই আপত্তিকর ও অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন পালাদিনো। তার ভাষ্য, এটি একটি সতর্কবার্তাও যে জনআস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো বামপন্থি ও বিদেশি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে কী ঘটতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু নাইন-ইলেভেনে নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি নির্মম অবজ্ঞা নয়; বরং ওই দিন আসলে কী ঘটেছিল, সেই মৌলিক সত্যকে দুর্বল করার একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা। ইউরোপ, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ক্রমবর্ধমান ইসলামপন্থি রাজনীতির চাপে পড়ছে, তখন এটি সরাসরি ইসলামপন্থার স্বার্থে কাজ করছে।’

সিবিসির ওই স্মারকে বলা হয়েছে, ‘ছিনতাইয়ের ফলে যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়।’ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস এবং পেন্টাগনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকেও এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষে ভরা ভবনের দিকে সেটি পরিচালিত করার ঘটনাকে শুধু ‘বিমান বিধ্বস্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা কতটা যথাযথ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শুধু সিবিসিই নয়। মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও (এপি) তাদের সাংবাদিকদের জন্য ব্যবহৃত ‘এপি স্টাইলবুকে’ ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘সন্ত্রাসী’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এই স্টাইলবুক দেশজুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও সম্পাদকেরাও অনুসরণ করেন।
এপির স্টাইলবুকে বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদ হলো ভয় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ব্যবহার।’ তবে এরপরও ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘সন্ত্রাসী’ শব্দ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘শব্দগুলো রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে এবং প্রায়ই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হয়। এগুলো যেহেতু বিপুল ধরনের কর্মকাণ্ড ও ঘটনাকে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা যায় এবং এগুলো নিয়ে বিতর্কও অত্যন্ত তীব্র, তাই কী ঘটেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা করাই বেশি নির্ভুল এবং পাঠক-দর্শকের জন্যও বেশি উপযোগী।’

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের শব্দ কিছু ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলার যুক্তিও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য আইসিই এজেন্টদের গুলিতে নিহত ব্যক্তিদের ‘দেশীয় সন্ত্রাসী’ বলেছেন। আবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লস অ্যাঞ্জেলেস ও পোর্টল্যান্ডে পুলিশের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে নাইন-ইলেভেনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কী বলা হবে? যারা ওই হামলা চালিয়েছিল, তাদের কি শুধু ‘বিমান ছিনতাইকারী’ বলা হবে? ফোর্বসের মতে, এমন শব্দে পুরো ঘটনার উদ্দেশ্য যেন ধরা পড়ে না। একইভাবে টুইন টাওয়ার, পেন্টাগন এবং শেষ পর্যন্ত শ্যাঙ্কসভিলে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের ঘটনাকে শুধু ‘বিমান বিধ্বস্ত’ বলা হামলাকারীদের উদ্দেশ্য কিংবা তাদের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ প্রভাবকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না।
ফোর্বস লিখেছে, ‘সন্ত্রাস’ ও ‘সন্ত্রাসী’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে সিবিসির এই নীতি নতুন নয়। ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পরও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিল কানাডার এই সম্প্রচারমাধ্যম।
তখন সিবিসি বলেছিল, ‘সন্ত্রাসী’ শব্দের ক্ষেত্রে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহারের নীতি তাদের কয়েক দশকের পুরোনো। বিবিসি, এপি, এএফপি ও রয়টার্সসহ আরও অনেক সংবাদ সংস্থাও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করে।

সিবিসির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্য হলো এ ধরনের নৃশংস ঘটনার তথ্য নির্ভুলতা, স্পষ্টতা ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা; সহিংসতার ঘটনা যেখানেই ঘটুক, তার ব্যাপ্তি ও মাত্রা তুলে ধরা; ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ করা এবং এসব ঘটনা সম্পর্কে কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত জানানো।
সিবিসি আরও বলেছিল, ‘আমরা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনাগুলো তুলে ধরি। তবে সিবিসি নিউজ নিজে থেকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী বা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে না— ঘটনাটি যে অঞ্চলেই বা যেভাবেই ঘটুক না কেন। কারণ এসব শব্দের সঙ্গে এত বেশি অর্থ, রাজনীতি ও আবেগ জড়িয়ে আছে যে এগুলো শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
ফোর্বসের মতে, সিবিসির এই যুক্তির যথেষ্ট ভিত্তি আছে। তবে প্রতিবেদকের নিজের টেলিভিশন সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন উঠেছে— নাইন-ইলেভেন মেমোরিয়ালের (স্মৃতিসৌধ) সামনে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ওই ভয়াবহ দিনের ঘটনাকে শুধু ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা’ হিসেবে তুলে ধরা কতটা যথাযথ?
source: Rajneete







