রংমিস্ত্রির সহকারী থেকে সন্ত্রাসী/দুই হাতে গুলি চালানো তার শখ, ঘুমান এসএমজি নিয়ে

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে তেমন কিছু নেই, নাম সই করতে পারলেও পড়তে পারেন না। পেশায় শুরুতে ছিলেন রংমিস্ত্রির সহকারী। তবে এক দশকের ব্যবধানে তিনি হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম জেলার আতঙ্কের অন্য নাম—‘গলাকাটা মোবারক’। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু তৈয়ব থেকে শুরু করে কারাবন্দী সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’-এর আশ্রয়ে সন্ত্রাসী হয়ে উঠেন তিনি। অন্তত সাতটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং একাধিক চাঁদাবাজির মাস্টারমাইন্ড সেই মোবারককে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তথ্যসূত্র: প্রথম আলো
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গত ২৬ আগস্ট ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকা থেকে তার তিন সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে মোবারক ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন। পুলিশও পাল্টা গুলি চালিয়ে তাকে কাবু করে। পুলিশের ভাষ্যমতে, মোবারক যে পিস্তল দিয়ে পুলিশকে গুলি করেছেন, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারক। ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামের এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার পর তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর সন্ত্রাসী নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন মোবারক। নাছির কারাগারে যাওয়ার পর উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের (বর্তমানে কারাগারে) সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পুলিশের ভাষ্য, ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতেন মোবারক। ইমনও বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, মোবারক বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী। সাজ্জাদের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন মোবারক। সাজ্জাদ বাহিনীতে সাহসী ও অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হিসেবে তার কদর ছিল। দুই হাতে গুলি চালাতে পারেন মোবারক।
পুলিশ আরও জানায়, ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের সঙ্গেও মোবারকের যোগাযোগ ছিল। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকতেন মোবারক। বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি আবুল কাশেম।
মোবারকের প্রকাশ্যে যত খুন
অন্তত সাতটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং একাধিক চাঁদাবাজির সঙ্গে মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি-মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া গত বছরের ২৯ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়। ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডারত অবস্থায় ঢাকাইয়া আকবর নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলকর্মী ইব্রাহিমকে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অক্সিজেন-পশ্চিম কুয়াইশে মো. মাসুদ ও মো. আনিছকে হত্যা করা হয়। এক মাস পর চান্দগাঁওয়ে চায়ের দোকানে বসে ইট-বালু ব্যবসায়ী তাহসীনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ফটিকছড়ির জামাল ও সাদ্দাম হত্যাসহ অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডে মোবারকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, চাঁদা না পেলেই ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে মোবারকের বিরুদ্ধে। নগরের চন্দনপুরায় আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে পুলিশি পাহারার মধ্যেই গুলি চালানোর ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ওই হামলা করা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
এ ছাড়া গত বছরের ২০ আগস্ট হাটহাজারীর মেখল এলাকায় একটি ইটভাটা ও আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাড়িতেও গুলি করা হয়। অভিযোগ, ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ওই হামলা চালানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে মোবারক ও তার সহযোগীদের বাড়ির উঠানে এসে গুলি করতে দেখা যায়। ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে ব্যবসায়ী আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে গত ১৪ মে গুলির ঘটনাতেও মোবারকের উপস্থিতি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
পুলিশ জানায়, খুন ও চাঁদাবাজি শেষে দুর্গম পাহাড়ে চলে যেতেন মোবারক। ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ছিল তার নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে আত্মগোপন করে কিছুদিন কাটানোর পর পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার তিনি ফিরতেন লোকালয়ে।
পুলিশের দাবি, পাহাড়ে যোগাযোগ ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মোবারক তার প্রথম স্ত্রী ডলি চাকমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী রুনু আক্তারের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সহযোগিতা পেতেন। পুলিশের ভাষ্য, ডলির মাধ্যমে পাহাড়ি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মোবারকের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। অস্ত্র কেনাবেচা ও মজুতের ক্ষেত্রেও তিনি ওই যোগাযোগ কাজে লাগাতেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মোবারকের যোগাযোগের তথ্য তারা পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দুই হাতে চালাতে পারেন গুলি, ঘুমাতেন এসএমজি নিয়ে
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক পুলিশকে জানিয়েছেন, ডেভিড ইমনের কাছে অস্ত্র চালানো শিখেছেন তিনি। দুই হাতে অস্ত্র চালানো তার শখ। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার সময় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে মোবারক ও তার সহযোগিরা। মাসুদুল হকরাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
এদিকে গ্রেপ্তারের পর মোবারকের কাছে এসএমজি নিয়ে ঘুমানোর একটি ছবি পেয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, এসএমজি নিয়ে ঘুমাতে তার ভালো লাগে। গ্রেপ্তার এড়াতে নিজের সঙ্গে সব সময় বিদেশি পিস্তল রাখতেন মোবারক। আর হাতের নাগালে রাখতেন এসএমজি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ছবিতে থাকা এসএমজিটি পলাতক সন্ত্রাসী রায়হানের কাছে রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন মোবারক। অস্ত্রটি উদ্ধারে অভিযান চলছে।
source: Asia Post







