মুসলিমদের উপর গণহত্যা চালানো ‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু

বসনীয় সার্ব বাহিনীর সাবেক সামরিক প্রধান রাতকো ম্লাদিচ মারা গেছেন। ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় ভূমিকার জন্য ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত এই যুদ্ধাপরাধী নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।
বৃহস্পতিবার সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস তার মৃত্যুর খবর জানিয়েছে।
ম্লাদিচের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। সম্প্রতি তিনি একাধিকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাকে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল সার্বিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা ও তার পরিবার। তবে দ্য হেগের সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন নাকচ করে দেয়।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধের সময় প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত এবং ২২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। ওই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা।
জাতিসংঘের নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষিত স্রেব্রেনিৎসায় ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন সার্ব বাহিনী প্রায় ৮ হাজার বসনীয় মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করে। নিহতদের অনেকের মরদেহ গণকবরে ফেলে রাখা হয়। পরে প্রমাণ গোপন করতে বেশ কয়েকটি গণকবর খুঁড়ে মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে পুনরায় দাফন করা হয়েছিল।
স্রেব্রেনিৎসা দখলের সময়ের ভিডিওতে ম্লাদিচকে শিশুদের হাতে মিষ্টি তুলে দিতে দেখা যায়। পরে নারী ও শিশুদের বাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পুরুষদের জঙ্গলের দিকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। যারা পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন, তারা সার্ব বাহিনীর হাতে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের ভয়াবহ বর্ণনা দেন।
১৯৯৫ সালের নভেম্বরে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। সামরিক পদ থেকে বরখাস্ত হলেও তিনি আরও ১৬ বছর গ্রেপ্তার এড়িয়ে ছিলেন। সার্বিয়ায় সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বিলাসী জীবনযাপন করছিলেন তিনি। তবে ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোশেভিচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
অবশেষে ২০১১ সালের মে মাসে সার্বিয়ায় গ্রেপ্তার হন ম্লাদিচ। পরে তাকে দ্য হেগে পাঠানো হয়।
ম্লাদিচ তার বিচার ও পরবর্তী আপিলের পুরো সময়ই গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০১৭ সালে তাকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২১ সালে আপিলেও সেই সাজা বহাল থাকে।
বিচারকরা তাকে মুসলিম ও বসনীয়দের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করে তথাকথিত ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত জাতিগত নিধন অভিযানের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়ী করেন।
ট্রাইব্যুনাল সে সময় ম্লাদিচের অপরাধকে মানবজাতির জানা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছিল। জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারপ্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন তাকে ‘অশুভের প্রতিমূর্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে সার্বিয়ার অনেক মানুষ এখনও ম্লাদিচকে বীর হিসেবে দেখেন। নিজেকে তিনি একজন ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরতেন এবং দাবি করতেন, নিজের জনগণকে রক্ষা করার জন্যই তিনি এসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
জীবনের শেষ দিকে তার আইনজীবীরা মানবিক কারণে মুক্তির আবেদন করেন। তাদের দাবি ছিল, ম্লাদিচের অসুস্থতা নিরাময়যোগ্য নয় এবং তার আয়ু খুবই সীমিত হওয়ায় তাকে কারাগারে রাখা অমানবিক শাস্তির শামিল।
ম্লাদিচের জন্মসাল নিয়েও বিতর্ক ছিল। তিনি দাবি করতেন, ১৯৪৩ সালের মার্চে তার জন্ম। তবে ট্রাইব্যুনালের নথিতে তার জন্মসাল ১৯৪২ উল্লেখ করা হয়েছিল।
source: Asia Post






