ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে কানাডার কড়া পদক্ষেপ, ৭০০ মার্কিন পণ্যে শুল্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শুল্কযুদ্ধে এবার কঠোর জবাব দিল কানাডা। মার্কিন শুল্কের সমপরিমাণ পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ শতাধিক পণ্যে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছে অটোয়া।
এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠল। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। মার্কিন ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য ও ইলেকট্রনিক্সসহ নানা খাত এর আওতায় পড়বে। পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি সামলাতে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা সরকার।
কাতারের সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার কানাডা সরকার জানিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের সমপরিমাণ বা ‘ডলার-ফর-ডলার’ নীতিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে তারা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা এক ডলার শুল্কের বিপরীতে সমানহারে শুল্ক বসাবে কানাডা। একই সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে নতুন আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
কানাডা সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, নতুন পাল্টা শুল্ক ৭০০টিরও বেশি পণ্যের ওপর কার্যকর হবে। এর আওতায় থাকবে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ, প্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিকস পণ্য। এসব পণ্যে শুল্কের হার হবে ১৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত, যা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
এ ছাড়া শুল্কের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে সহায়তা দিতে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের (৫ দশমিক৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) একটি তহবিল ঘোষণা করেছে অটোয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পরই অটোয়ার পক্ষ থেকে এ পাল্টা শুল্কের ঘোষণা এলো। ট্রাম্পের ওই শুল্কের আওতায় পড়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্য। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই দুই দেশ একটি বাণিজ্যিক চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর সোমবার ট্রাম্প কানাডার গাড়ির ওপরও নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এর ফলে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে গাড়ি খাতে বিদ্যমান শুল্ক দ্বিগুণ হয়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কানাডাকে নিয়ে একাধিক কটূক্তিও করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার তিনি বলেন, অন্টারিও অঞ্চলের ‘লেক অন্টারিও’ হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। এ ছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ‘গভর্নর কার্নি’ বলে উল্লেখ করে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে যুক্ত করার নিজের বিতর্কিত অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, গত এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর কানাডার কাছে ৬০ বিলিয়ন ডলার করে বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে। তবে কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বা ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ট্রাম্পের দাবির বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল জাজিরা, তবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের খেসারত দিতে হবে দেশটির নিজেদের ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তাদেরই। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ায় কানাডার বাজারে চাহিদা কমে গেলে মার্কিন গাড়ি নির্মাতারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়বেন। অন্যদিকে, ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে কানাডা থেকে আমদানি করা ৫৫০ ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম মার্কিন পরিবারগুলোর জন্য বেড়ে যাবে।
জার্মানির ‘কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্কের মোট বোঝার ৯৬ শতাংশ শেষ পর্যন্ত মার্কিন আমদানিকারক ও ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়।
এদিকে দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনার মাঝে আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সোনা ও শেয়ারবাজারে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে। প্রতি আউন্স সোনার দাম ০ দশমিক ০৩ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৯৬ ডলারে দাঁড়ায়। কানাডিয়ান ডলার সূচক ০ দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ৭২ দশমিক ২৭-এ উঠেছে এবং টরন্টোর শেয়ারবাজারে এসঅ্যান্ডপি/টিএসএক্স সূচক বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ।
কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর দুই উত্তর আমেরিকান প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত উভয় দেশের ভোক্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে নেতিবাচক প্রভাবিত করতে পারে।
source: Rajneete







