নিষিদ্ধ গান বিশুদ্ধ বাদ্য/মিউজিক ও সঙ্গীত বিতর্ক নিয়ে আলোচিত মানিকের বই

মিউজিক, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ‘হালাল-হারাম’ বিষয়ক বিতর্ক বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। সুফি গান, গজল ও কাওয়ালি ঘরানার শ্রোতাপ্রিয় এক সঙ্গীতশিল্পীর ‘মিউজিকবিহীন’ গান পরিবেশনের ঘোষণা ঘিরে সুধীমহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা।
অনেকের ধারণা, পরিবার ও ‘আদর্শিক’ চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে হয়েছে আলোচিত সেই শিল্পীকে। তিনি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ায় নেটিজেনদের মাঝেও বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মেরুকরণ বেশ স্পষ্ট। তবে প্রশ্ন জাগে—এই বিতর্ক কি আদতে কেবল ধর্মীয় বোধের জায়গা থেকে উৎসারিত, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অনুষঙ্গ?
বহুল চর্চিত ও সংবেদনশীল এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে প্রকাশিত হয়েছে প্রাজ্ঞ ও মননশীল গ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ গান বিশুদ্ধ বাদ্য’। বইটি লিখেছেন সংস্কৃতি জগতের দ্রোহী অথচ সুরেলা অভিযাত্রী আমিরুল মোমেনীন মানিক। তিনি একাধারে জীবনমুখী ধারার সঙ্গীতজ্ঞ, শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিক। দেশীয় সংস্কৃতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্র শিল্প-সাহিত্যের বহুমাত্রিক বিরোধ ও অমীমাংসিত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গ্রন্থটিতে অনুসন্ধান করেছেন এক সুচিন্তিত সমাধানের পথ। পেন্ডুলামের মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি পোস্টমর্টেম করেছেন সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের।
গ্রন্থে সূচনাতেই লেখক এক চিরকালীন ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন—‘তবে কি সংগীতের সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের বিরোধ চলতেই থাকবে? প্রচণ্ড তত্ত্ব-তালাশ, বহুবিভাজিত মতামত ও বিধি-নিষেধের ঘেরাটোপে অনেকে বিশ্বাসে আঘাত হেনে গড্ডলিকায় ভেসে যাচ্ছেন। অনেকে আবার বিভাজন আর বহুমতের মধ্যে খুঁজছেন ঐক্য ও ইতিবাচকতা। সোজা কথায় সোজা ভাবেই যদি বলি, তাহলে নিষিদ্ধ গান সেটাই, যে গান মানুষকে বিভ্রান্ত করে। আর বিশুদ্ধ বাদ্য সেটাই, যে বাদ্য মনের মধ্যে বিভ্রান্তির পরিবর্তে এক পরম শীতলতা তৈরি করে। কিন্তু এরকম বাদ্য কি আদতে আছে? সেখানেই বড় প্রশ্নের আনাগোনা!’
লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করা যাক। গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন—সংগীতের হালাল-হারাম সংক্রান্ত এই অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব নিরসনের মতো কোনো তাত্ত্বিক গুরুভার তিনি বহন করেন না। তা সত্ত্বেও, শিল্পের প্রধানতম কাজ—অর্থাৎ ‘প্রশ্ন উত্থাপন করা’—তিনি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আমিরুল মোমেনীন মানিক সবিনয়ে স্বীকার করেছেন যে তাঁর চিন্তার জগতেও বিচ্যুতি থাকতে পারে; তবুও তিনি একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা জনসমক্ষে হাজির করার সাহস দেখিয়েছেন। সেই চিন্তার সূত্র ধরে পাঠককে আরও গভীর ভাবনার জগতে প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিক্রিয়াশীলতা মানুষকে বড় করে না; বরং চিন্তার পারস্পরিক সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমেই নতুন গন্তব্য নির্ধারিত হয়। বাংলা সঙ্গীতের আঙিনায় একদিন প্রকৃত সুদিন আসুক, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বাসী মানুষের হৃদয় শীতল হোক এবং সংখ্যালঘুর প্রতি জন্ম নিক গভীর সহমর্মিতা—এটাই লেখকের মূল প্রত্যাশা। কোনো কূপমণ্ডূক আবেগ যেন আমাদের চিন্তার দরজাকে চিরতরে রুদ্ধ করে না দেয়, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন ও সোচ্চার।
সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মের বাস্তবিক রূপকে নিজের অনুভবে ধারণ করে সঙ্গীতে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে গভীর ও নিরপেক্ষ আলোচনা করেছেন লেখক। স্বনির্মিত বয়ান আর যুক্তির কষ্টিপাথরে তিনি খণ্ডন করতে চেয়েছেন প্রচলিত গৎবাঁধা বিশ্বাস। অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে নানা প্রশ্ন উত্থাপন এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করালেও তিনি নিজের মতামত পাঠকের ওপর বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দেননি; বরং তা সোপর্দ করেছেন পাঠকের নিজস্ব বোধ ও বিবেচনার ওপর।
সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের বিষয়টিতে পবিত্র কোরআন, হাদিস, ফিকাহ এবং বরেণ্য চিন্তাবিদদের বয়ান-বিশ্লেষণ ও প্রামাণ্য দলিল সংযুক্ত করা হয়েছে এই গ্রন্থে। ফলে প্রচলিত প্রশ্নগুলোকে এক লহমায় খারিজ করে দেওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই। লেখকের এই ধারালো ও ঋদ্ধ যুক্তিতর্ক পাঠের সময় মত-দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ থাকলেও, তুচ্ছ জ্ঞান করে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
একটি অধ্যায়ে মানিক লিখেছেন—‘বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ইসলামী বিশ্বে দুটো মতামত প্রচলিত। আলেমদের এক পক্ষ বলেছেন, হালাল। অন্য পক্ষের মত, হারাম। পাঠক, আমি আপনাদেরকে বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ইসলামের প্রায়োগিক প্রক্রিয়া জানার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আপনাদেরকে তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কৃতি-স্বরূপ লক্ষ্য করার অনুরোধ করছি। মিশরের স্কলার ড. ইউসুফ আল কারযাভীর হালাল-হারাম বিষয়ক বইটি পড়ার কথা বলছি। কারণ ইসলামের মূল সৌন্দর্য হচ্ছে প্রয়োগে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি নয়, ইসলামকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করাই হচ্ছে বড় বিষয়।’ এই অংশে লেখক তাঁর দার্শনিক এবং আদর্শিক অবস্থান জানান দিয়েছেন ভণিতাহীন বাস্তবতায় ও সরাসরি।
‘নিষিদ্ধ গান বিশুদ্ধ বাদ্য’ গ্রন্থের সূচিপত্রে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ‘হালাল-হারামের বেড়াজালে সংগীত’, ‘বাদ্যযন্ত্র হালাল না হারাম?’, ‘বাদ্যযন্ত্রের পোস্টমর্টেম’, ‘মাছ-ভাতের মতো গানও জরুরি খাবার’, ‘সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক ধারা: হামদ-নাতের মেহফিল’, ‘মুক্তির লড়াইয়ে জীবনমুখী গান এবং পালাবদলের হাওয়া’, ‘সমাজকে বদলে দিতে পারে সংগীত’, ‘জীবনমুখী গানের কৈফিয়ত’, ‘গণসংগীত ও গণঅভ্যুত্থান’ এবং ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’সহ মোট ১২টি অধ্যায়ে শিল্প-সংগীত ও সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে।
বইটি পাঠের সময় কিছু বক্তব্যে দৃষ্টি আটকে যায়—‘মানুষের কল্যাণের জন্যই ইসলাম। আল-কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয়-মানুষ। সুতরাং কল্যাণ ও মানবতার পথে এগিয়ে যাওয়াই হলো ইসলামের মূল স্পিরিট। ইসলাম শুধুমাত্র ধর্ম নয়, একটি জীবনব্যবস্থা। কেউ যদি একটি গাছ লাগান, তাহলে প্রকৃত অর্থে বলা যায় তিনি একটি ইসলামী কাজ করলেন। কিন্তু আলাদা করে এর ‘ইসলামী ব্র্যান্ডিং’-এর প্রয়োজন হয় না। মানুষের জন্য কল্যাণকর সবকিছুরই ব্যাখ্যা ইসলামে আছে।’
অধ্যয়ন, গবেষণা ও তত্ত্ব-তালাশের বর্তমান আকালের যুগে বই কিনে পাঠ করার প্রবণতা যখন ম্রিয়মাণ, তখন লেখক সমাজের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্প ও সুন্দরের ভাষায় এক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। লাঠি হাতে কোনো হুলিয়া জারি করে তিনি শিল্পীর ভুবনভোলা সুর বা সম্মোহনী বাদ্যযন্ত্র কেড়ে নেননি; বরং তাঁকে প্রদান করেছেন এক শিল্পসম্মত ও সহজাত স্বাধীনতা—যেখানে ধর্মীয় অনুশাসন বা পরিমিতিবোধও লঙ্ঘিত হয়নি। প্রবাদপ্রতিম এই সত্য তো সর্বজনবিদিত—যা কিছু পরম সুন্দর, তার অপর নামই তো ‘ইসলাম’।
সংস্কৃতিকর্মী, গবেষক এবং মননশীল পাঠকদের জন্য গ্রন্থটি একটি অবশ্যপাঠ্য সংযোজন। বইটি প্রকাশ করেছে জনপ্রিয় শিল্পী তাওহীদুল ইসলামের প্রকাশনা সংস্থা ‘গানের খেয়া’। শিল্পী আরিফুর রহমানের নান্দনিক লেটারিং সম্বলিত ‘নিষিদ্ধ গান বিশুদ্ধ বাদ্য’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছেন আর. করিম ও মোহাম্মদ আদনান। মাত্র ৩০০ টাকা মূল্যের বইটি পরিবেশন করছে ‘ছোটদের সময়’ এবং এর অনলাইন পরিবেশক ‘রকমারি ডট কম’। ইতোমধ্যে পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ভিন্নধারার এই প্রকাশনাটি। বিশুদ্ধ শিল্পভাষ্য এবং গবেষণালব্ধ এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াসের জন্য আমিরুল মোমেনীন মানিক আমাদের নিরন্তর প্রশংসা ও অভিবাদন পাওয়ার যোগ্য।
source: Asia Post







