News

শরীরে গাঁজা শনাক্ত: এবার মাদক পরীক্ষায় ব্যর্থ আরও ২ ভারতীয় পাইলট

ভারতের ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট মাঝ আকাশে হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনার তদন্তে বিমানের ক্যাপ্টেনের শরীরে গাঁজা শনাক্ত হয়েছিল। আলোচিত এ ঘটনার পরে পাইলটদের মাদক পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই পরীক্ষায় আরও দুই পাইলট প্রাথমিক ধাপে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল এখনো পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে দুজনকেই ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, নতুন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) অংশ হিসেবে এয়ার ইন্ডিয়া তাদের সব পাইলটের মাদক পরীক্ষা করাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি পাইলট এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল পেতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।

এই উদ্যোগের সূত্রপাত গত ৪ আগস্টের ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের ঘটনায়। ১৩৭ জন যাত্রী ও আটজন ক্রু নিয়ে এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটটি ফুকেট থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। মাঝ আকাশে এয়ারবাস এ-৩২০নিও মডেলের ওই উড়োজাহাজটি হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। ওই ঘটনায় ২০ যাত্রী ও চার ক্রু আহত হন।

উড়োজাহাজ অবতরণের পর পাইলট-ইন-কমান্ডকে দুটি প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করাতে বলা হয়। দুটিতেই তিনি ব্যর্থ হন এবং তার শরীরে গাঁজার উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ফার্স্ট অফিসারের পরীক্ষার ফল অবশ্য নেগেটিভ আসে। বিশেষ করে দ্বিতীয় পরীক্ষায় ক্যাপ্টেনের গাঁজা সেবনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তবে তিনি কখন বা কোথায় গাঁজা সেবন করেছিলেন, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

আরো পড়ুন

উড়োজাহাজে কোনো গুরুতর ঘটনার পর স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর অনুযায়ী উভয় পাইলটেরই পোস্ট-ফ্লাইট ড্রাগ স্ক্রিনিং করার নিয়ম রয়েছে। এ ঘটনার পর দুই পাইলটকেই সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে ফ্লাইটটি মাঝ আকাশে নিচে নেমে যাওয়ার কারণ শুধু পাইলটের মাদক পরীক্ষায় ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনার সময় উড়োজাহাজটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় চার সেকেন্ডের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে ছিল এলিভেটর ও এলেরন। একই হাইড্রলিক ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে স্পয়লারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। এ-৩২০নিওর তিনটি হাইড্রলিক ব্যবস্থায় একাধিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর এলিভেটর ও এলেরন কোনো পাইলটের নির্দেশ ছাড়াই নড়াচড়া করছিল। এ ধরনের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা আগে নজিরবিহীন।

উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণে হাইড্রলিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলিভেটরের মাধ্যমে বিমানের নাক ওপরের দিকে ওঠানো বা নিচের দিকে নামানো হয়। এলেরন ডান ও বাম ডানার প্রান্ত কাত করে বিমানকে ডানে বা বাঁয়ে ঘোরাতে সহায়তা করে। আর স্পয়লার উড়োজাহাজের উড্ডয়নশক্তি কমিয়ে বাড়তি বাধা তৈরি করে, যার মাধ্যমে গতি কমানো ও নিচে নামতে সহায়তা করা হয়। অবতরণের সময় ব্রেকিংয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঘটনার পর প্রথম দিকে এটিকে ‘টার্বুলেন্স’ বা বায়ুর অস্থিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানানো হয়েছিল। পরে উড়োজাহাজের সিস্টেমের লগ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্টতা আসে। এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ‘ফ্লাইট সেফটি’ প্রতিবেদনের তথ্যের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, ফার্স্ট অফিসার বিমানটির গতি দ্রুত বাড়াতে এবং স্টল বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিচে পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতে বিমানের নাক খাড়া করে নিচের দিকে নামাতে বাধ্য হন।

এতে উড়োজাহাজে তীব্র নেতিবাচক ‘জি-ফোর্স’ তৈরি হয়। নাক এত দ্রুত নিচের দিকে নেমে যায় যে, কয়েক মুহূর্তের জন্য বিমানটি স্বাভাবিক মহাকর্ষীয় গতির চেয়েও দ্রুত নিচে নামতে থাকে। সিটবেল্ট বাঁধা না থাকায় অনেক যাত্রী ও ক্রু আসন থেকে উঠে শূন্যে ভাসতে শুরু করেন।

সে সময় সিটে না থাকা ক্যাপ্টেন পরে ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, নিজেও শূন্যে ছিটকে পড়ার পাশাপাশি ফার্স্ট অফিসার ও ককপিটের বিভিন্ন খোলা জিনিসপত্রকে বাতাসে ভাসতে দেখেন। পরে ইঞ্জিনের ওয়ার্নিং ডিসপ্লেতে একটি হলুদ সতর্কতা বার্তা দেখা যায়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, বিমানটি ঘটনার সময় তার সহনশীলতার সর্বনিম্ন সীমা (-1g structural limit) অতিক্রম করেছিল।

ক্যাপ্টেনের বর্ণনা অনুযায়ী, ককপিটে ছিটকে পড়ার পর তিনি মাঝআকাশে থাকা ফার্স্ট অফিসারকে স্থির রাখার চেষ্টা করেন। এরপর তির্যকভাবে নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সিটবেল্টের সংকেত চালু করেন। আসনে বসে সিটবেল্ট বাঁধার পর তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ কন্ট্রোলস’ এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন। তখনও বিমানটি নিচের দিকে নামছিল। গতি ও উচ্চতা কমে যাওয়া ঠেকাতে পাইলট থ্রটল সর্বোচ্চ ধারাবাহিক থ্রাস্টে নিয়ে যান।

সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। উড়োজাহাজটি স্থিতিশীল হওয়ার পর দুই পাইলট একে অপরের খোঁজ নেন এবং ককপিটের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। পরে বিষয়টি কলকাতা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাইলটরা এ-৩২০ উড়োজাহাজটি নয়াদিল্লিতে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন।

এর আগে এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ম মেনে তারা নিয়মিতভাবে ক্রু সদস্যদের মাদক পরীক্ষা করে থাকে। কোনো নির্দিষ্ট ফ্লাইট বা পরিচালনাগত ঘটনার সঙ্গে এসব পরীক্ষার সম্পর্ক নেই বলেও জানিয়েছিল বিমান সংস্থাটি।

source: Rajneete

আরো দেখুন
Close
Back to top button