হামলা চললেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ‘সমঝোতার কাছাকাছি’: পাকিস্তান

আঞ্চলিক জলসীমায় জাহাজে নতুন করে হামলার খবরের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘সমঝোতার কাছাকাছি’ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি সমঝোতার সম্ভাবনা আবারও জোরালো হয়েছে। একই দিন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে কাতারও।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, পাকিস্তান ও কাতারের মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল সোমবার দুই পক্ষের সর্বশেষ বক্তব্য ও পালটাপালটি দাবির পর সমঝোতার সম্ভাবনা অবশ্য অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, ‘পরিস্থিতি আবারও শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো ব্যবস্থা বা সমঝোতার পক্ষে এগোচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘গত দুই-তিন দিনের সংকেতগুলো বলছে, আমরা কোনো এক ধরনের সমঝোতার খুব কাছাকাছি রয়েছি।’
এদিকে মঙ্গলবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। আরাগচির টেলিগ্রাম চ্যানেলে এ তথ্য জানানো হলেও বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এ ছাড়া মঙ্গলবারের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানান। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে আলাদা আলোচনা এখন একটি অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তান ও কাতার ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে পালটাপালটি হামলায় হাজারও মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের।
পালটা জবাবে ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে ইরান।
সমঝোতার আশায় তেলের দামে পতন
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার তেলের দাম কমেছে। এর আগে দিনের শুরুতে এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল তেলের দাম। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এখনো তেলের দাম অনেক বেশি।
রোববার ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পরিচালিত হয়। তবে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, শুধু ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইরানের এসব শর্তের বেশিরভাগই গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে।
এর এক দিন পর সোমবার রাতে নতুন কিছু দাবি সামনে আনেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, ইরানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার পথ আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘গত ৫০ বছরে তারা যে ক্ষতি করেছে, তার জন্য আমরা অর্থ চাইব।’ এই ক্ষতিপূরণের মধ্যে বেসামরিক বিক্ষোভকারী এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাই যদি ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, তাহলে আমার মনে হয় ইরানেরই সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’
উপসাগর ও লোহিত সাগরে দুই জাহাজে হামলা
কূটনৈতিক অগ্রগতির কিছুটা আভাস পাওয়া গেলেও উপসাগরীয় ও লোহিত সাগর অঞ্চলে জাহাজে নতুন হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব হামলা সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বাড়তে থাকা ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি ছোট কার্গো জাহাজে সন্দেহভাজন হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলাটি ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মিসরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ জাহাজে নিহত এই চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুতিদের হামলায় এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। তবে হুতিরা এখনো হামলার দায় স্বীকার করেনি।
এদিকে পাকিস্তানের উপকূলের কাছে ওমান উপসাগর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কনটেইনার জাহাজেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল জাহাজটির ক্রুরা। এরপর একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার জাহাজটিতে হামলা চালায়।
ইরানের বন্দরগামী জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার অবরোধের ঘোষণা দেয় গত এপ্রিল মাসে। জুনের শান্তি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর জুলাইয়ে আবারও সেই অবরোধ কার্যকর করা হয়।
অন্যদিকে ২০ জুলাই লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দেয় হুতিরা। তারা এটিকে সৌদি আরবের কথিত ‘অবরোধের’ জবাব হিসেবে উল্লেখ করে। তবে ইয়েমেন অবরুদ্ধ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিয়াদ।
যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ওপর চাপ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ভোটারদের মধ্যে এই যুদ্ধ ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।
কয়েক মাস পর দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে জ্বালানির উচ্চমূল্য ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
তবে এখন পর্যন্ত কয়েক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানেও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে জুলাইয়ে টানা দুই সপ্তাহ সামরিক হামলাও চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর পরও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি এখন উন্মুক্ত এবং ‘এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে’।
source: Rajneete







