News

হরমুজ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ট্রাম্পের

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। এর মধ্যেই ইরানের কাছে পালটা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানের হামলায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের জন্য তেহরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দুই দেশের পালটাপালটি ক্ষতিপূরণ দাবির মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সোমবার (১০ আগস্ট) হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের কারণে গত ‘৫০ বছর’ ধরে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তার প্রশাসন অর্থ আদায়ের চেষ্টা করবে। তেহরানের দাবির সরাসরি জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে তেহরান বলেছে, ওয়াশিংটন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। ইরানের দাবিগুলো জুনে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির শর্তগুলোর সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে পরে সেই চুক্তি ভেঙে যায়।

ইরান ও ওমানকে আলাদা করা এই নৌপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হতো। এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে ট্রাম্পের নতুন ক্ষতিপূরণ দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা ক্ষতিপূরণ চেয়েছে, আপনি বলতে পারেন। অথবা তারা আমাদের করা ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থ চেয়েছে। আমি বলেছি, এটি ভালো ধারণা।’ এরপর তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, আমরা গত ৫০ বছরে তারা যে ক্ষতি করেছে, তার জন্য অর্থ চাইব।’

ট্রাম্প বলেন, এই অর্থের মধ্যে ওই অঞ্চলে নিহত মার্কিন সেনাদের পাশাপাশি ইরানে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি থাকবে। তার দাবি, গত চার মাসে ইরানে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তেহরানের হিসাবে, জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, ওই ঘটনায় প্রায় ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ জনই ছিলেন বিক্ষোভকারী।

‘বাক্যবিনিময়’

ট্রাম্প আরও বলেন, ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোলে হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারকেও তেহরানের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। তবে ওই হামলার জন্য ইরান নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছে।

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের উচিত লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর জন্য দায় নেওয়া।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। কখনো তিনি কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো শিগগির শান্তিচুক্তি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে তিনি ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুমকি দিয়েছিলেন। পরে আবার সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ইঙ্গিত দেন, তারা শান্তিচুক্তির কাছাকাছি। সপ্তাহের শেষ দিকে তিনি বলেন, সংঘাত নিয়ে তার অবস্থান তিনি ‘লো-কি’ বা তুলনামূলকভাবে নিচু পর্যায়ে রাখছেন। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি আরও সামরিক হামলার পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে যেতে প্রস্তুত।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ সহকারী চার্লস কাপচান ট্রাম্পের ক্ষতিপূরণ দাবিকে ‘বাক্যবিনিময়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই পক্ষেরই শক্তিশালী কারণ রয়েছে।

চার্লস কাপচান আল জাজিরাকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখানে শুধু কিছু পালটাপালটি বক্তব্য দেখছি, যেখানে ইরানি বা ট্রাম্প প্রশাসন— কেউই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে এগোচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ইরান তার তেল রপ্তানি করতে না পারলে টিকে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে, ট্রাম্পও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় গ্যাসের দাম বেশি বাড়ুক, তা চান না। এ ছাড়া মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবরের কারণে পেন্টাগনের ওপরও চাপ রয়েছে বলে জানান তিনি।

হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা

এর আগে ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের মধ্যে নতুন নৌপথ নির্ধারণ করে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি রয়েছে তারা। তবে তেহরান এ-ও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে সামরিক হুমকি বন্ধ করার বিষয়টিও রয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এর ফলে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘সুষ্ঠু ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে’। দুই দেশের মধ্যে নৌপথের একটি মানচিত্র নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।

বাঘাই বলেন, আলোচনায় সাধারণত অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয়— এমন কিছু সেবার বিষয়ও উঠে এসেছে। এর মধ্যে নিরাপদ নৌ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা এবং অপরাধ দমনের মতো বিষয় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। তেহরান ইরানের বন্দরগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধকে ‘আগ্রাসনের কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সোমবার জানিয়েছে, জুলাইয়ে অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজকে ‘অচল’ করে দিয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধের ফলে উপসাগরে অবস্থিত ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ হয়ে গেছে।

সোমবার ট্রাম্প অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, সে হলো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী।’ তিনি আরও দাবি করেন, নৌপথটি খোলা রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখান থেকে মাইন সরিয়ে দিয়েছে।

এদিকে, বিভিন্ন শিপিং ডেটা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার প্রণালিটি দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হলেও শনিবার তা কমে ১১টিতে এবং রোববার মাত্র ছয়টিতে নেমে আসে।

মেরিনট্রাফিক আরও জানিয়েছে, ইরান নির্ধারিত নৌপথ দিয়ে ১৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। আরও ১০টি জাহাজ এমন একটি পথ ব্যবহার করেছে, যেটিকে ‘অনির্ধারিত’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

source: Rajneete

Back to top button