যুদ্ধের ‘ফাঁদে’ ট্রাম্প, বের হওয়ার পথ এখনো অজানা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে একদিকে হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা— দুইয়ে মিলিয়ে স্পষ্ট হয়েছে— এ সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনতে গিয়ে ট্রাম্প ক্রমেই কঠিন এক অবস্থায় পড়ছেন। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি দাবি করেছিলেন, এটি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে!
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা— ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় থাকা একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি মেনে নেওয়া, যা কার্যকর হলে যুদ্ধের আগে কখনো না পাওয়া হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ পাবে তেহরান; অন্য পথে ট্রাম্প চাইলে তার দেওয়া হুঁশিয়ারি অনুযায়ী সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন, যাতে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত ও অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম বিকল্পটি গ্রহণ করলে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এটিই হবে ইরানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অর্জন। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির ওপর অন্তত আপাতত ইরানের তদারকি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই এমন পরিস্থিতি ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল।
আর দ্বিতীয় পথ, অর্থাৎ নতুন করে বড় পরিসরে বিমান হামলা চালানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ নভেম্বরেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। সে নির্বাচনের আগে নতুন হামলা তার জন্য বড় চাপের কারণ হতে পারে। তাছাড়া আগের বোমা হামলা যেখানে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি, সেখানে নতুন হামলা সেটি পারবে— এমন নিশ্চয়তা নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ট্রাম্প চাইলে বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থাও বজায় রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকবে এবং জাহাজ চলাচলে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র পালটা জবাব দেবে। তবে এই পথেও তিনি এমন একটি যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার সুযোগ পাবেন না, যা তার ভাষ্য অনুযায়ী এপ্রিলের মাঝামাঝির মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান— উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘কোনো বিকল্পই ভালো কিছু নয়। তবে ট্রাম্প হয়তো বুঝতে শুরু করেছেন, এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছাতেই হবে। আর সেটি হতে পারে প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া।’
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো ‘অস্থায়ী’ নৌ পথ এমন হতে হবে, যেন কোনো ধরনের বাধা না থাকে এবং কোনো পক্ষই জাহাজ চলাচলের ওপর তদারকি না করে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে টানাপোড়েন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বরাবরই বলে আসছেন, হরমুজ প্রণালি একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই থাকতে হবে। সেখানে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকা চলবে না এবং কোনো ধরনের টোল বা ফি আরোপ করা যাবে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের ওপর ইরানের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে অতীতে যুদ্ধ ইস্যুতে রুবিওর বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্প একাধিকবার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এবারও তিনি তা করতে পারেন।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেশি, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে এবং যুদ্ধটি মার্কিন জনগণের কাছেও অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও ট্রাম্পের কঠোর ভাষা ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি। বরং বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে ট্রাম্পকেই।
আলোচনায় ফেরার পূর্বশর্ত
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন চায়, সেই আলোচনা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই এগোক, যা শুরু থেকেই ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালির দুই তীরের দেশ ইরান ও ওমানের মধ্যে যে সমঝোতা হতে পারে, তা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে কি না।
রয়টার্সকে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সূত্র ও আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি হয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পাবে তেহরান। ট্রাম্প বলেছেন, প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি খুবই কাছাকাছি। তবে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে।
ইরান-ওমান চুক্তি চূড়ান্ত হলেও এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। কারণ, জুনে দুই দেশ যে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল, তা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। ওই প্রাথমিক চুক্তির মাধ্যমে শুরু থেকেই ইরান কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেয়েছিল, যা ট্রাম্পের নিজ দলের অনেক রিপাবলিকান নেতার সমালোচনার মুখে পড়ে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই এখন ধরে নিচ্ছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে এই সংঘাত চলতেই থাকবে। কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সেপ্টেম্বর থেকেই আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হবে।
এটি ট্রাম্পের জন্য নতুন রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনি প্রচারে তিনি বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এদিকে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছে তার রিপাবলিকান পার্টি।
তবে ওই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ‘পরিবর্তনশীল জনমত জরিপ’ দেখে নেওয়া হচ্ছে না।
যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ
ট্রাম্প নিয়মিত দাবি করে আসছেন, তিনি ইরানের বহু শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছেন এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্যগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই তিনি সফল হতে পারেননি।
গত শনিবার ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অংশীদার দেশ কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করায় তিনি নতুন বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও কঠোর হামলা চালানো হবে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। যদিও ট্রাম্প এ দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে কোনো ঘাটতি নেই।
বুধবার লাস ভেগাসে এক সমাবেশে ট্রাম্প আবারও পরস্পরবিরোধী বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি চুক্তি করতে চাই, কারণ আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। কিন্তু একটা সময় এমন পরিস্থিতি আসবে, যখন আমাদের তা করতেই হবে।’
আলোচনার বিষয়ে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর পালটা হামলা চালানো হবে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা দেখছে, আগামী কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
এমনকি ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের সমর্থক এবং এত দিন ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিকে সমর্থন করা ব্যক্তিরাও এখন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ইরানবিরোধী থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিসের বেহনাম বেন তালেবলু এক্সে লিখেছেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক নভেম্বরের আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এমন এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে চাইছে, যেখানে যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, তিনি ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
তালেবলু আরও লিখেছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র কোথায় প্রভাব খাটাতে পারে, আর কোথায় পারে না— সেটি তাদের বাস্তবভাবে বিবেচনা করা উচিত।’
source: Rajneete







