সাক্ষাৎকার

কী রকম সমাজে আমরা বাস করি, সব সামনে চলে এসেছে

ভারতীয় গণমাধ্যম ডেমোক্রেসি নাউ এর কোয়ারেন্টিন রিপোর্ট অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আ্যমি গুডম্যান এবং নারমিন শাইখ। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ১৬ এপ্রিল।

আ্যমি গুডম্যান: ভারতে এখন ছয়টি প্রধান শহর করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হট স্পট, কর্তৃপক্ষ এগুলোকে রেড জোন বলে ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রাজধানী নয়া দিল্লি এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র মুম্বাইও রয়েছে। সারা দেশে এই পর্যন্ত ৪২০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছে, সংক্রমণের শিকার হয়েছে অন্তত ১২ হাজার মানুষ। পরীক্ষার অভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা সতর্ক করেছেন নরেন্দ্র মোদীর সরকার এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কাজে লাগাচ্ছেন। চলতি মাসে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে প্রখ্যাত সাংবাদিক সিদ্ধার্থ বরদারাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার কিছুদিন আগেই তিনি এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকের সমালোচনা করেছিলেন দেশ জুড়ে লকডাউনের মধ্যেও অসংখ্য মানুষের ভিড়ে ভরা এক ধর্মীয় সমাবেশে অংশ নেয়ায়। এছাড়া গত মঙ্গলবার ৬৯ বছর বয়সী অধিকারকর্মী আনন্দ তেলতুমবদে এবং ৬৭ বছর বয়সী সাংবাদিক গৌতম নভলাখাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, দুজনেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে বানোয়াট দাবি করেছেন। গ্রেপ্তারের সময় ভারতীয় জনতার কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে তেলতুমবদে বলেছেন ‘জানি না কবে আবার আপনাদের সামনে কথা বলতে পারব। তবে আমি আশা করি, আপনাদের পালা আসার আগেই আপনারা মুখ খুলবেন’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী করোনাভাইরাসের কারণে দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেছেন, যার আওতায় পড়েছে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ, বিশ্বে এটাই সর্বকালের সবচেয়ে বড় লকডাউনের ঘটনা। মোদী জানিয়েছেন, এই লকডাউন মে মাস অবধি চলবে। সরকারের কাছে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি সহায়তার দাবিতে মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ করেছে শত শত অভিবাসী শ্রমিক, যারা এই লকডাউনের কারণে একই সাথে কাজ হারিয়েছে এবং আটকা পড়েছে।

এ বিষয়ে আরও কথা বলতে নয়া দিল্লি থেকে যোগ দিচ্ছেন পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক, লেখক এবং অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। সম্প্রতি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে ‘প্যানডেমিক ইজ এ পোর্টাল’ শিরোনামে তিনি নতুন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এটি তার প্রকাশিতব্য বই, ‘আজাদি: ফ্রিডম ফ্যাসিজম ফিকশন’ এর অন্তর্ভুক্ত। তার সব শেষ বই হলো ‘মাই সেডিটিয়াস হার্ট: কালেক্টেড ননফিকশন’। নিজের প্রথম উপন্যাস, ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ এর জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার প্রাইজ জেতেন তিনি।

নয়া দিল্লিতে আসলে কি হচ্ছে, এবং কেন আপনি এই মহামারিকে একটি পোর্টাল বা দ্বার হিসেবে দেখছেন?

অরুন্ধতী রায়: আপনি জানেন ভারতে কভিড-১৯ সংকট দেখা দিয়েছে, যার পুরো চেহারাটা আসলে কেমন আমরা এখনো জানি না। আপনি নিজেই একটি পরিসংখ্যান দিয়েছেন, সেই সঙ্গে এটাও বলেছেন যে এই পরিসংখ্যান কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা আমরা জানি না। কারণ খুব বেশি পরীক্ষা করা হচ্ছে না। অন্যদিকে আশপাশে তাকালেই দেখতে পারবেন নিউ ইয়র্কের মতো এখানকার হাসপাতালগুলোতে কিন্তু অতটা চাপ নেই। তার মানে এই রোগ এখনো আমাদের ওপর জোরেশোরে থাবা বসাতে পারেনি। তবে আমাদের কভিড সংকট আছে। সেই সঙ্গে আছে ক্ষুধার সংকট। বিদ্বেষের সংকট। এবং কভিড ছাড়াও আমাদের স্বাস্থ্য সংকট রয়েছে। আপনি যেমনটা বলছিলেন, গত ২৪ মার্চ মাত্র ৪ ঘণ্টার নোটিশে, যা কিনা রাত আটটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ছিল, মোদী কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই ১৩৮ কোটি মানুষের এই দেশে লকডাউনের ঘোষণা দিলেন। ফলে, কোনো ধরনের পরিকল্পনা, কোনো ধরনের ভবিষ্যৎ চিন্তা ছাড়াই এ পদক্ষেপ বিরাট সংকট ডেকে এনেছে। যদিও কেরালা খুব ভালো কাজ করেছে, কিন্তু কেন্দ্র সরকারের দিক থেকে এই সংকটটি মহামারির চাইতেও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আপনি এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন, যেখানে লকডাউনের আওতায় রয়েছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এবং অভিবাসী শ্রমিক। যেখানে লকডাউনের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেখানে এটি উল্টো এই সব মানুষগুলোকে শারীরিকভাবে আরও ঘনীভূত করছে। মানুষগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ছে, পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে তাদের কাছে কোন খাবার নাই। এমনকি অর্থের জোগানও নাই। তারা তাদের ফোন বিক্রি করে দিয়েছে। আপনি বুঝতে পারছেন, আপনি একরকম বিস্ফোরকের ওপর বসে আছেন। আবার একই সময়ে, আপনি যেমনটা বললেন, মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আপনি যাদের নাম বললেন শুধু তারাই নয়, আরও অনেকেই। দ্য ওয়্যারের সম্পাদক সিদ্ধার্থ বরদারাজনকে গ্রেপ্তারই করা হয়নি, তার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। মোদীর বিরুদ্ধে কথা বলা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এফ আই আর হয়েছে। গৌতম নভলাখা এবং আনন্দ তেলতুমবদে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তরুণ ছাত্র, জনতা এবং অসংখ্য মুসলমানের বিরুদ্ধে এখন দিল্লির উত্তরাঞ্চলে দাঙ্গায় অংশ নেয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, চক্রটা ক্রমশ গুটিয়ে আনা হচ্ছে।

আমি যে কারণে এই মহামারিকে একটি পোর্টাল বলছি, কারণ সারা বিশ্বেই এখন এমন এক পরিস্থিতি যেখানে একদিকে ক্ষমতাশালীরা চেষ্টা করছে নজরদারি, বৈষম্য, ব্যক্তি মালিকানা আর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে। অন্যদিকে বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী চাচ্ছে নিজেদের মধ্যে সংহতি বাড়াতে, যারা ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও জানতে চায়, বুঝতে চায়। এই মহামারি কাঠামোগত সংকট, সমাজে বিরাজমান সর্বব্যাপী অন্যায় এবং বৈষম্যের চেহারাটা প্রকাশ করে দিয়েছে। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে লকডাউনের ঘোষণা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগেরও ইঙ্গিত দেয়। কারণ তিনি জানেন এই দেশের কাঠামোটাই এমন যে এটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিই সামলাতে পারে না, মহামারি তো দূরের কথা।

অরুন্ধতী, মোদীর এই চার ঘণ্টার নোটিশে লকডাউন ঘোষণা নিয়ে আমি আপনাকে আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই। তিনি ঘোষণাটি দিলেন রাত আটটায়, ২৪ মার্চ রাত ১২টা থেকে এটি কার্যকর হলো। কিন্তু ভারতে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। এটা কিন্তু পরিষ্কার নয় যে তিনি কেন লকডাউন ঘোষণা করতে সাত সপ্তাহ সময় নিলেন। যখন প্রথম লকডাউন ঘোষণা হলো আপনি তখন প্রেস পাস ব্যবহার করে অভিবাসী শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন। সব গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও এ রকম হাজার হাজার শ্রমিক দিল্লি ছাড়তে বাধ্য হয়। আপনি এদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন, তাদের পরিস্থিতিটা বলবেন?

অরুন্ধতী রায়: লকডাউন ঘোষণার সাথে সাথে গণ পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, এটি ছিল মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ। বেশির ভাগ মানুষই বেতন পায়নি, যারা সত্যিকার অর্থেই দিন আনে দিন খায়। তারা যেসব ছোট্ট ঘুপচি মধ্যযুগীয় বস্তিতে থাকে, যেখানে এক ঘরে ৫ থেকে ১০ জন লোক গাদাগাদি করে থাকে, তার বাড়িওয়ালা কিন্তু ঠিকই সময়মতো ভাড়া চায়। ফলে তাদের চলে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এটি একটি পরাবাস্তব দৃশ্য, একদিকে যখন রাস্তায় কোন যানবাহন নেই, অন্যদিকে হঠাৎই এই কাঠামোগত বৈষম্য, এই আতঙ্ক এবং লজ্জা যে কিরকম সমাজে আমরা বাস করি, সব আমাদের সামনে চলে এসেছে। এবং আমি বুঝতে পারলাম এই মানুষ গুলো হাঁটতে শুরু করেছে, নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশে শত শত কিলোমিটার হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে তারা।

আমি তাদের কাছে গেছি কারণ মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে টেকটোনিক প্লেট বদলে যাচ্ছে। এটি একটি অসম্ভব ঘটনা। আমি দিল্লি আর উত্তর প্রদেশের সীমান্তে গেছি, তাদের সাথে সাথে হেঁটেছি। এদের মধ্যে অনেকেই সাম্প্রতিক ভয়াবহ দাঙ্গা থেকে বেঁচে ফেরা মুসলমান। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর এক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা পাল্টা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল বলে তা সেভাবে সম্ভব হয়নি। কিন্তু সেই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এখন তাদের মাইলের পর মাইল হেঁটে ঘরে ফিরতে হচ্ছে।

এদের বেশির ভাগই কাঠমিস্ত্রি, দরজি এবং নির্মাণ শ্রমিক। আর এরা সবাই কিন্তু ভাইরাসের কথা জানে। প্রায় সবাইই মাস্ক পরেছিল। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে তারাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা ছিল অসম্ভব। গুজব ছড়িয়েছিল যে তাদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হবে, আর সাথে সাথেই সেখানে এক লাখ মানুষ জড়ো হয়ে গেল, গাদাগাদি করে তারা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আমি কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভাইরাস নিয়ে তারা কি ভাবছে। তাদের উত্তর ছিল ‘ভাইরাস নিয়ে যা-ই ভাবি না কেন, এই মুহূর্তে আমাদের খাবার নাই, পানি নাই, ঘুমানোর জায়গা নাই। তাই আমাদের বাড়ি যেতেই হবে’। ভাইরাসের চেয়েও এটাই ছিল তাদের বর্তমান বাস্তবতায় বড় সংকট।

এদের অনেকেই মনে করে, এটা বড়লোকের অসুখ, যা কিনা বিমানে চড়িয়ে এ দেশে আনা হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করেছে ‘আমাদেরকে চাকরি থেকে, ঘর থেকে লাথি দিয়ে বের করে দেয়ার বদলে বিমানবন্দরে কেন তাদের থামালেন না?’ একজন তো আমাকে বলেছেন, আমি ওনার কথা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের ওই প্রবন্ধে লিখেছি, ‘মনে হয় মোদীজী আমাদের কথা জানেন না’ হয়তো তার কথাই সত্যি, সরকার এবং আর যারা সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এই মানুষগুলোকে তাদের কল্পনা থেকে স্রেফ মুছে দিয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সবকিছু থেকেই। শুধুমাত্র এনজিওর ব্রোশিয়ারে এই গরিব লোকগুলোর দেখা মেলে, অর্থ সহায়তার আশায়।

অরুন্ধতী, আমি আপনাকে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সময়টিতে ভারতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সফর নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। সেই বিখ্যাত ছবি, যেখানে স্টেডিয়ামে এক লাখ মানুষের মধ্যে মোদী এবং ট্রাম্প হাত মেলাচ্ছেন।

অরুন্ধতী রায়: এক লাখ নয়, ১০ লাখ। ভারতে সংখ্যাটি ছিল ১০ লাখ, আর যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ হাজার।

তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলেন, তারপরই তিনি মহামারির প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ কি তা নিয়ে একজন মার্কিন বিজ্ঞানীর মন্তব্য পড়েন। এতে তিনি এতই ক্ষিপ্ত হন যে বিজ্ঞানীদের সাথে আসন্ন বৈঠক বাতিল করে দেন। তারপর হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে ভারতের সাথে ওই ঘটনা।

‘ডক্টর ট্রাম্প’, আমি এটা সচেতনভাবেই বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন জন্য চাপ দিয়েছেন। তার আগ পর্যন্ত মোদী এই ওষুধ বিক্রি এবং রপ্তানির বিরুদ্ধে অভিযানে নামার কথা বলে আসছিলেন। আর এখন একের পর এক গবেষণায় বেরিয়ে আসছে যে হাইড্রোক্লোরোকুইন নিয়ে পরীক্ষায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।

অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ।

সার্বিক ভাবে ট্রাম্প মোদীর জন্য এবং মোদী ট্রাম্পের জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র জোট এবং আমাদের দেশে এর প্রভাব আসলে কেমন, তা নিয়ে একটু বলুন।

অরুন্ধতী রায়: এটি এমন এক পরিস্থিতিকে বৈধতা দিচ্ছে যা টিভি সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করে বলা কঠিন। তবে, আপনি জানেন, আমি দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে লেখালেখি করে আসছি। আমি আগেও বলেছি, খাদ্যের সংকট, ঘৃণার সংকটের কথা। এমন এক সময়ে মোদী যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন এবং সেখানে হাউডি মোদী অনুষ্ঠানটি করলেন, আবার যখন ট্রাম্প ভারতে এলেন তখন হলো নমস্তে ট্রাম্প। এ যেন দুজনের এক অদ্ভুত নৃত্য। আমি দুঃখিত এভাবে বলার জন্য, কিন্তু দুজন মানুষ যারা ততটা বুদ্ধিমান নয় কিন্তু অসম্ভব ক্ষমতাশালী মানুষ, তারা আসলে দুই দেশের আতঙ্কজনক পরিস্থিতিকেই একভাবে বৈধতা দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের সাথে যা হচ্ছে, জাতিবিদ্বেষ, তালিকার বাইরে থাকা শ্রমিক, আর ভারতের বিজেপি সরকার, আর সংস্কৃতিগতভাবে তার মাতৃসংগঠন আর এস এস, প্রধানমন্ত্রী মোদী যার সদস্য, যারা বিশ্বাস করে ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া উচিত, আর বাকি সবাই এর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। যে উদ্দেশ্যে তারা নতুন নাগরিকত্ব আইন তৈরি করেছে, বন্দিশালা তৈরি করছে। আর এর সবকিছুকেই বৈধতা দেয়া হচ্ছে এমন একটা ধারণা দিয়ে যে, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল মানুষটি মোদীকে ভালোবাসেন। আর তাদের দুজনের মাঝে, আমি বলতে চাইছি যে এটা দুঃখজনক যে এমন এক সময় এই মহামারি যখন দেশে দেশে ক্ষমতায় আছে এদের মতো মানুষ।

সে জন্যেই আমি বলেছি এই মহামারি একটি পোর্টাল, আমরা কি ঘুমের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে এ রকমই ফ্যাসিস্ট নজরদারির রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছি না? যেমন ধরুন আরোগ্য সেতু অ্যাপ, যা মোদী ভারতীয়দের ডাউনলোড করতে বলেছেন এবং যা এরই মধ্যে বিশ্বের দ্রুততম সময়ে সর্বাধিক ডাউনলোড হওয়া অ্যাপ, এ পর্যন্ত ৫ কোটিবার ডাউন লোড করা হয়েছে এটি। বিশেজ্ঞরা সবাই বলছেন এটি নজরদারির অ্যাপ। এ রকম আরও আছে এবং বহু গণতান্ত্রিক সমাজ সে পথেই যাচ্ছে। মহামারির কারণে যে উদ্বেগ এবং আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তার মাধ্যমে।

তবে এই করোনাভাইরাসের বহু প্রভাব রয়েছে, যার কোন কোনটা আপনার হৃদয় উষ্ণতায় ভরিয়ে দেবে। আজ নিউ ইয়র্ক টাইমসে আমি পড়ছিলাম, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সংহতি বাড়াচ্ছে। আমি একটা চমৎকার ভিডিও দেখেছি যেখানে পাকিস্তানের একজন চিকিৎসক একটি ভেন্টিলেটর কয়েকজনকে এক সাথে ব্যবহার করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। অথচ এখানে করোনাভাইরাসের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হচ্ছে। করোনা জিহাদের মতো একটি ধারণার জন্ম হয়েছে। আমি পড়েছি, ১৯৩০ সালে নাৎসিরা কীভাবে পরিকল্পিত ভাবে ইহুদিদের টাইফাসের জন্য দায়ী করে, তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। এখানে মুসলিমদের সঙ্গেও তা-ই করা হচ্ছে।

আপনাকে মূলধারার গণমাধ্যমের ভাষা এবং রাস্তার মানুষের জনগণের ভাষার পার্থক্য বুঝতে হবে। এটি খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যাকে ট্রাম্প এবং তার সাথে সাক্ষাৎ এবং করমর্দন করা অন্য সব ক্ষমতাশীল ব্যক্তি পুরোপুরিভাবে বৈধতা দিচ্ছে। তারা এটা দেখতে পাচ্ছে না যে এই ভাইরাস কীভাবে এগোচ্ছে, কীভাবে মানুষে মানুষে বৈষম্য, অন্যায়কে প্রকট করে তুলছে। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে তারা নিজেরাও ভয় পাচ্ছে। কারণ তারা জানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার্ত, তারা না খেয়ে মরছে। কিভাবে তারা এই মানুষগুলোর ক্ষোভ সামলাবে? ভারতে তারা কিভাবে এটি করবে সেটা অবশ্য আমি বলে দিতে পারি। তারা এটাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করতে, মুসলমান-বিরোধী মনোভাব উসকে দেয়ার চেষ্টা করবে। তারা সব সময়েই এটা করে এসেছে। তবে একটা পর্যায়ে- আপনি জানেন এরই মধ্যে বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেছে। মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র পুড়িয়ে দিচ্ছে। ক্ষুধা এমনই এক জরুরি বিষয়, যা এখনই পদক্ষেপ নেয়ার দাবি রাখে। গুদামে খাবার মজুত আছে, কিন্তু সেগুলো বিতরণ করা হচ্ছে না। মানুষের নগদ অর্থ দরকার, কিন্তু তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারছেন না। এটা এমন এক সংকট, যেন আপনি কোন বিস্ফোরকের ওপর বসে আছেন। এই সংকট কিন্তু আরও বাড়বে। মজুত থাকা খাদ্যশস্য যখন বিতরণ হয়ে যাবে, পরের দফায় খাবার আসবে কোথা থেকে? কারণ এটা ফসল কাটার মৌসুম, কিন্তু এমনকি যারা ফসল কাটতে পারছে তারাও সে ফসল বেচতে পারছে না। তাছাড়া দেশের শস্য উৎপাদনের ধরনটাই বদলে গেছে অর্থকরী ফসল উৎপাদনের দিকে।

আমাদের সময় একেবারেই শেষের দিকে, আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অরুন্ধতী রায়: আচ্ছা, আচ্ছা। আপনাদেরও স্বাগত জানাই।

ভাষান্তর: মোহাম্মাদ সাঈদ জুবেরী চিশতী।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *