সাক্ষাৎকার

করোনা প্রতিরোধে মুক্তিযুদ্ধের মতো একসঙ্গে লড়তে হবে

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। মুক্তিযুদ্ধে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং ডা. এম এ মবিনের সঙ্গে মিলে সেখানে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ওষুধ নীতি’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারী পরিস্থিতিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষকদের করোনা পরীক্ষার কিট উদ্ভাবন এবং সংকট মোকাবিলার নানা উপায় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে কভিড-১৯ রোগ শনাক্তকরণে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবন কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : আমরা যেটি উদ্ভাবন করেছি সেটি একটি রোগ নির্ণায়ক পদ্ধতি। আমরা এ বিষয়ে যেসব তথ্য দিয়েছি, তাতে অনেকেই মনে করেছেন এর একটা যুগান্তকারী প্রতিক্রিয়া আছে। পদ্ধতিটা এত সহজ যে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা আমাদের মাথায় এলো না কেন? এটা একমাত্র গণস্বাস্থ্যের চিন্তাতে আসার প্রধান কারণ হলো, আমাদের প্রধান গবেষক বিজন কুমার শীল ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস কভিড-২ নির্ণয় করেছিলেন এ পদ্ধতিতে। ওটা পেটেন্ট করা আছে। চীনা সরকার সব স্বত্ব কিনে নিয়েছে।  এর ১৭ বছর পরে তিনি গবেষণা করছিলেন এ পদ্ধতিতে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় কি না। এর মধ্যেই গত নভেম্বরে যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলো তখন তিনি এর গতি-প্রকৃতি দেখে বললেন যে, এটা মহাবিপর্যয় ঘটাবে। আমি আমার গবেষণা বদলাতে চাই। আমি বললাম, ভালো।  তোমরা গবেষকরা যেটি ভালো মনে করো, সেটিই তো করবে। তার সঙ্গে চারজন ছিলেন। একজন হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিহাদ আদনান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জমিরউদ্দিন এবং একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফিরোজ। এদের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য যুক্ত হন আমাদের মেডিকেল কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মহিবুল্লাহ খন্দকার। এই পাঁচজনের টিমই এ কাজটি সম্পন্ন করেছে। এর বিস্তৃত সম্ভাবনা রয়েছে। ১৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা ফলাফল দিয়ে দিতে পারব। সবাইকে মনে রাখতে হবে, এটা চিকিৎসা নয়, রোগ নির্ণায়ক পদ্ধতি। এর ফলে বর্তমানে যে সবাই হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, এটা হবে না। এর কাঁচামাল আবার সব জায়গাতে পাওয়া যায় না। মাত্র চারটি দেশে এটি উৎপন্ন হয়। সেই চারটি দেশ হলো চীন, সুইজারল্যান্ড, গ্রেট ব্রিটেন আর যুক্তরাষ্ট্র। যেহেতু চীন এটার সংযত ব্যবহার করছে, তাই তারা এটা দিতে পারছে না। তাই আমরা ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আসছি। এসব কাজে লাগিয়ে সাভারে আমাদের উৎপাদন ইউনিটে প্রথমে আমরা ১০ হাজার কিট তৈরি করব। এর মধ্যে সরকারকে ১ হাজার কিট দেব। তারা পরীক্ষা করে দেখবে এটা কার্যকর কি না। তবে আমরা নিশ্চিত যে এটা ভালো কাজ করবে এবং এর দাম পড়বে মাত্র আড়াইশ টাকা।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে যে, তারা গণস্বাস্থ্যকে কিট উৎপাদনের অনুমতি দেয়নি, কেবল কিছু কাঁচামাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : ওষুুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখছে।  এ কারণেই তাদের সঙ্গে এ বৈরিতা। আরেকটি কারণ হলো, অজ্ঞতা।  এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। তাই ব্যবসায়ীরা যা বোঝাচ্ছে, তিনি সেটিই বুঝছেন। যে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে, সেটির টাকা কে দিয়েছে? খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে, সরকার দেয়নি, ওই আড়াই লাখ টাকা ব্যবসায়ীদের। তিনি তো আমাদের কাঁচামাল আমদানি করার অনুমতি দিয়েছেন। এখন সেই অনুমতিপত্র নিয়ে তো আমরা বসে থাকতে পারি না। আমরা তৈরি করব। সেক্ষেত্রে আমরা তৈরি করতে পারব, কিন্তু বিক্রি করতে পারব না। আমরাও তো বলছি যে বিক্রি করব না।  তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমরা এটা তৈরি করব এবং তৈরি করে সরকার অর্থাৎ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেই দেব। শুধু তারা নয় বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল, আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়কে দেব। এক হাজার কিট আমরা পরীক্ষা করতে তাদের দেব। তারা কম্পারেটিভ স্টাডি করবে।  পিসিআর (পলিমার চেইন রিঅ্যাকশন) পদ্ধতি করতে তিন থেকে পাঁচ দিন লাগে, আর আমাদের এটা করতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে। আমরা আশা করি আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে স্যাম্পল দিয়ে দিতে পারব। আর আমাদের প্রত্যাশা সরকার পরীক্ষা করে ৭ দিনের মধ্যে ফলাফল জানাবে। তারা যদি এক্ষেত্রে অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে সেটা হবে দুঃখজনক। কেননা ইতিমধ্যে অন্যান্য দেশ এটা কিনে নিতে চাচ্ছে। যদি আমরা বাংলাদেশের জনগণকে এটা দিতে না পারি, তাহলে আমাদের দুঃখ থেকে যাবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কি করোনা পরীক্ষার এই টেস্টকিট তৈরির ফর্মুলা অন্যদের দেবে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : অবশ্যই দেব। আমরা এটাকে একেবারে উন্মুক্ত করে দেব। এমনটি পেনিসিলিনের ক্ষেত্রে হয়েছিল। পেনিসিলিন কখনো পেটেন্ট করা হয়নি। ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কার হওয়ার পরে পেটেন্ট করা হয়নি। অবশ্য আমেরিকনরা এটা নিয়ে পরে পেটেন্ট করে ফেলে। করোনা শনাক্তকরণের এই কিটের দাম সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে। যে কেউ চাইলে যেন এটার বাড়তি দাম নিতে না পারে। ১৯৮২ সালে যে ওষুধ নীতি হয়েছিল, যার সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম, সেখানে একটা নিয়ম আছে যে, এসবের দাম সরকার নির্ধারণ করবে। আমাদের প্রত্যাশা, এক্ষেত্রে যেন সে নিয়মটি মানা হয়।

দেশের ১ শতাংশ মানুষের যদি করোনা পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় তাহলে কিট লাগবে ১৭ লাখ। আবার প্রবাসী বা বিদেশফেরতদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এসব পরিসংখ্যান কি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অব্যবস্থাপনার পরিচায়ক বলে মনে করেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এখানে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সমন্বয়ের বড়ই অভাব রয়েছে। জাতীয় সংসদে অন্তত ১০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের সঙ্গে তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে আলাপ করেননি।  সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান কিংবা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হকের সঙ্গেও তো তিনি আলাপ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।  আমাদের বুঝতে হবে এই ধরনের জাতীয় দুর্যোগ ১৯৭১ সালের পরে আর আসেনি। তাই আমাদের সম্মিলিতভাবে এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু এটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সমন্বয়ের অভাব।

দেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে একমাত্র সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর-এ।  কিন্তু অনেকেই বলছেন যে করোনা পরীক্ষা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন ছিল।  এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এক্ষেত্রে সরকার একটা ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে। আমার অনুমান, সরকার এটা করেছে এজন্য যে তারা মনে করেছে যদি আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হয়ে যায় তাহলে একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। সে বিবেচনায় হয়তো সরকার এটা করেছে। তবে আমি মনে করি, এটা সরকারের ভুল কাজ।  সরকারের উচিত ছিল এ পরীক্ষার দায়িত্ব ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বা আইসিডিডিআরবি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা বিএসএমএমইউকে দেওয়া। অন্তত তিনটি জায়গায় এ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। পিসিআর তো আমাদের আছে।  ঢাকা মেডিকেল কলেজেরও আছে। এ পদ্ধতিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাগে। কেননা একটা কিটেরই দাম ১৫০ মার্কিন ডলার। আর অন্যান্য মেটিরিয়ালস এবং কেমিক্যাল মিলে আড়াই হাজার টাকা লাগে। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন লোক সার্বক্ষণিকভাবে লাগে। তবে আমার মতে, যতটুকু আছে ততটুকু ব্যবহার করে ফেলা উচিত ছিল। এখন তো চীন থেকে ১০ হাজার টেস্ট কিট আসছে। ৭০০-এর মতো আছে। আর পিসিআর আসছে ২০টি।  এগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে। আইইডিসিআরের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো, তারা ফোন ধরে না। ধরলেও জিজ্ঞাসা করে যে, বিদেশ ফেরত কি না। বিদেশ ফেরত না হলে তারা পরীক্ষা করে না। অথচ তাদের উচিত ছিল মানুষের সমস্যা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং ব্যবস্থা নেওয়া।

দেশে করোনার দ্রুত বিস্তৃতি ঘটছে। এ পর্যন্ত সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে তা কি পর্যাপ্ত?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : না। আমার মতে, আরও এগ্রেসিভ রোল নিতে হবে।  আমরা এখন আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি। এখনো পর্যন্ত অল্প কিছু আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু যখন এটার দ্রুত বিস্তার ঘটবে, তখন আমরা সামাল দিতে পারব না। শুধু লকডাউন করলেই হবে না। লকডাউনের ফলে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য কীভাবে জুটবে? তাদের কি এক মাসের রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে? এই যে ছুটি দেওয়া হলো, তখন বলা উচিত ছিল, ঢাকার বাইরে যাওয়া যাবে না। এর ফলে তো আরও বিস্তার ঘটার সুযোগ হলো। শুধু খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জেলখানায় তো আরও নব্বই হাজার রয়েছে।  অন্তত ৫০ হাজারকে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।  আর সংবাদ মাধ্যমের গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। টেলিভিশনে প্রচারণা চালাতে হবে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেখাতে হবে, সালাম দেবেন, নমস্কার দেবেন, কিন্তু হাত মেলাবেন না। শরীর খারাপ লাগলে মসজিদে যাবেন না।  মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে একহাত দূরে দাঁড়াবেন। মন্দিরে পুরোহিতদের বলতে হবে ভোজনের সময় গায়ে গায়ে থাকা যাবে না। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আদালতে ২০৫ ধারা অনুযায়ী মামলার আসামিকে হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। তাহলে কোর্টে ভিড়টা কমে যাবে। বাস বন্ধ করলে হবে না। প্রত্যেক বাসস্ট্যান্ডে তাপমাত্রা মাপার জন্য পাঁচজনকে দায়িত্ব দিতে হবে। সেখানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আগে বাড়তে হবে।

তবে, এখন সরকারের অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে সমালোচনা না করে সরকারকে সমর্থন দেওয়া উচিত। তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত। সরকারেরও উচিত সমস্ত রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী এবং গুরুত্বপূর্ণ সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা করা। শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। আবার জরিমানা করেও হবে না। আমাদের সামগ্রিকভাবে করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে হবে। যেমনটি আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একত্রে করেছিলাম। পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের তো বাঁচতে হবে। আর এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মতো করোনাভাইরাস প্রতিরোধেও আমরা জয়লাভ করব।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *