News

মরক্কো থেকে ২৪ ঘণ্টায় ৬০ হাজার অভিবাসী স্পেনে, ৩৪ প্রাণহানি

মরক্কো থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় অভিবাসীদের ঢল নেমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত এই শহরে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছেন বলে জানিয়েছেন সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিবিসির খবরে বলা হয়, এক সংবাদ সম্মেলনে ভিভাস বলেন, সেউতায় পৌঁছানোর এই চেষ্টার সময় অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চলতি মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এক রায়ের পর এই বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশের ঘটনা ঘটল। ওই রায়ে আদালত বলেছেন, সেউতা বা আরেক স্প্যানিশ ভূখণ্ড মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না।

এদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরিস্থিতিটিকে ‘হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধভাবে প্রবেশ করা সব অভিবাসীকে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ মরক্কোয় ফেরত পাঠাতে সরকার কাজ করছে। ইউরোপের বেশ কয়েকজন নেতাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতা মূল ভূখণ্ড স্পেন থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে বিচ্ছিন্ন। ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টাকারী অভিবাসীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশপথ।

সেউতায় অভিবাসীদের প্রবেশের চেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ার পর স্থানীয় কর্মকর্তারা মাদ্রিদের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মনে হওয়ার পর সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বৃহস্পতিবারের ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, হাজার হাজার মানুষ সাঁতরে শহরটিতে প্রবেশ করছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবারও অভিবাসীদের প্রবেশ অব্যাহত ছিল।

স্পেনের কর্মকর্তাদের দেওয়া এই বিস্ময়কর হিসাব অনুযায়ী, গত এক দিন বা তার কিছু বেশি সময়ে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীর সংখ্যা শহরটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি হতে পারে। সর্বশেষ স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, সেউতার জনসংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০।

সেউতা ও এর পাশের শহর মেলিলায় নিরাপত্তা জোরদার করতে স্পেন এখন দেশটির সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে। মেলিলাতেও রাতভর ৩০০ থেকে ৪০০ জনের প্রবেশের খবর পাওয়া গেছে।

শুক্রবার সেউতা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এসব প্রবেশের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি স্পেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার ওপর হামলা।

তিনি আরও বলেন, মরক্কোর সঙ্গে সীমান্ত আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।

সানচেজ বলেন, অপরাধী চক্র সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়কে ব্যবহার করে মানুষকে বিপজ্জনকভাবে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। তাঁর ভাষ্য, গত কয়েক ঘণ্টায় ভুল তথ্য ‘দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে’।

অবৈধভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় মরক্কোর কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে বলেও জানান তিনি।

সেউতা ও মেলিলার স্পেনের সঙ্গে সম্পর্কের ইতিহাস ১৫ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৯৫ সাল থেকে এই দুই ভূখণ্ড সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে।

মরক্কো দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই ভূখণ্ডের দাবি করে আসছে। ফলে স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলো দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আফ্রিকার সঙ্গে একমাত্র স্থলসীমান্তও এই দুই ভূখণ্ড।

মরক্কো থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনেকেই তরুণ, তাদের বেশির ভাগই পুরুষ। তবে ভিড়ের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, এমনকি নবজাতক শিশুকেও দেখা গেছে।

কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় অবৈধভাবে ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৭ হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক।

সাধারণত সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীরা উপকূলের আরও ওপরের দিক থেকে কয়েক কিলোমিটার সাঁতরে আসেন। কিন্তু এবার তারা খুব সহজেই সীমান্ত বেড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে। শুরুতে কেউ কেউ জেটির পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে এবং সেটির শেষ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বেশির ভাগকে অন্য পাশের সৈকতে পৌঁছাতে সাঁতরে যেতে হয়েছে।

এই সময় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা কোথায় ছিলেন এবং কেন অভিবাসীদের দলগুলোকে ছত্রভঙ্গ বা আটকে দেওয়া হয়নি, তা স্পষ্ট নয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক অভিবাসী বলেন, তিনি মরক্কোয় ফিরে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটা মোটেও ভালো নয়, মজারও নয়। মানুষ এখানে মারা যাচ্ছে। আমি অনুরোধ করছি, আপনি যদি এখনো না এসে থাকেন, তাহলে আসবেন না। এটা করবেন না।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে সেউতার রাস্তায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শহরের এক বাসিন্দা স্পেনের এবিসিকে বলেছেন, মানুষ ভয় পেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কেউ রাস্তায় বের হচ্ছে না। তারা ভয় পাচ্ছে।’

স্পেনের একটি সংবাদমাধ্যমকে এক হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘আমরা আগে যা দেখেছি, তার চেয়ে এটা অনেক বেশি শক্তিশালী ও আগ্রাসী।’

এর আগে সেউতায় অভিবাসীদের প্রবেশের বড় ধরনের ঢল দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালে। তবে এবারের তুলনায় তা ছিল অনেক ছোট পরিসরের। ওই সময় পশ্চিম সাহারার সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাদ্রিদের সঙ্গে বিরোধের জেরে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ হাজার মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় ঢুকতে দিয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ সম্প্রতি আলজেরিয়া সফর করার পর সেই কূটনৈতিক বিরোধ আবারও উত্তপ্ত হয়েছে। আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়।

ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার ঘটনাবলি নিয়ে দ্রুত মন্তব্য করেন। তিনি সেখানকার ছবিগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, এ ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন’ ইউরোপের জন্য নিরাপত্তা হুমকি।

তিনি বলেন, স্পেনের সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের অবাধ চলাচল চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি ইতালি বিবেচনা করবে। তবে বাস্তবে এর অর্থ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ইতালি ও স্পেন পরস্পরের প্রতিবেশী দেশ নয় এবং নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের উড়োজাহাজে করে অন্য দেশে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম।

পরে ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানায়, তারা পুরো শেনজেন চুক্তি থেকে স্পেনকে বাদ দেওয়ার কথা বলছে না। বরং ইতালি-স্পেন সীমান্তে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

সেউতায় পৌঁছানো অভিবাসীরা এখন সেখানেই আটকা পড়েছেন— তারা স্পেনের মূল ভূখণ্ডে নেই।

স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলোনির মন্তব্যকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন অংশীদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে আমরা ইউরোপীয় সংহতি আশা করি, দলীয় রাজনৈতিক কূটকৌশল নয়।’

শুক্রবার তিনি মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন সেউতা থেকে আসা ছবিগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এটি ‘অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে’।

ফিনল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারি রানতানেন মেলোনির প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, স্পেন তার সীমান্ত সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস মরক্কোকে ‘অবৈধ অভিবাসীদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়ার’ দাবি জানিয়েছেন।

শেনজেন এলাকা হলো ইউরোপের ২৯টি দেশের একটি উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা। এসব দেশ নিজেদের অভিন্ন সীমান্তে আনুষ্ঠানিক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে।

source: Rajneete

Back to top button