News

ওসি নিজেই চুরি করলেন ১৩০ কম্বল!

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে জব্দকৃত চোরাচালানের কম্বল সংখ্যায় কম দেখিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তিনি কম্বলের গুণগত মান গোপন এবং আসামিদের সুবিধার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে আদালতে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করিয়েছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন ওসি মনির।

একাধিক মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ, এসএমপি কমিশনারের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, কম্বল আত্মসাতের ঘটনায় এসএমপি কমিশনার মোগলাবাজার থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেনকে কৈফিয়ত তলব (শোকজ) করে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠিতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এ ছাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বক্তব্য, চুরির সময়ের ছবি এবং নানা বিশ্লেষণেও এর সত্যতা মিলেছে।

কমিশনারের চিঠি অনুযায়ী, মোগলাবাজার থানার একটি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে (মামলা নং: জিআর-০৫/২৬) একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে ৫৬০ পিস দ্বিস্তরবিশিষ্ট (ডাবল পার্ট) দামি ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। তবে মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেনের নির্দেশে মামলার মূল এজাহারকারী এক উপপরিদর্শক (এসআই) প্রকৃত সংখ্যা ও গুণগত মান গোপন করেন। তিনি জব্দতালিকায় ৫৬০ পিসের বদলে এজাহারে মাত্র ৪৩০ পিস কম্বল দেখান। এ ছাড়া কম্বলগুলো সিঙ্গেল পার্ট, নাকি ডাবল পার্ট, জব্দতালিকায় তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

তদন্তে দেখা যায়, সিলেট শাহপরান থানার অপর একটি মামলায় (জিআর-২৬৫/২৫) মো. কামরুল হাসান নামে এক ব্যক্তি আদালত থেকে নিলামে ৬৫৮ পিস এক স্তরবিশিষ্ট (সিঙ্গেল পার্ট) পাতলা কম্বল কেনেন। পরে তার কাছ থেকে দুই ব্যবসায়ী আরমান হুদা ২২৮ পিস ও মো. সেলিম আহমদ ৪৩০ পিস কম্বল কিনে নেন। এরপর আসামি ও চোরাকারবারিদের সুবিধা পাইয়ে দিতে মোগলাবাজার থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জিম্মানামার নতুন নাটক সাজান। মো. সেলিম আহমদ আদালতে আবেদন করেন, মোগলাবাজার থানায় আটক ৪৩০ পিস কম্বল আসলে শাহপরান থানার মামলা থেকে তার কেনা নিলামের কম্বল। ওসি মনিরের পরিকল্পনা ছিল, আদালতের মাধ্যমে কম্বলগুলো সেলিম আহমদের জিম্মায় দিয়ে দামি ডাবল পার্টের কম্বলগুলো নামমাত্র মূল্যে বের করে নেওয়া এবং এজাহারে গোপন রাখা অতিরিক্ত ১৩০ পিস কম্বল নিজেরা আত্মসাৎ করা।

এই মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন। আদালত আলামতের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলে কাজী তোবারক হোসেন সরেজমিন থানায় রক্ষিত কাভার্ড ভ্যানের কম্বল গণনা বা পরীক্ষা না করেই চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে একটি মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার প্রতিবেদনে বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ায় আদালত নতুন করে কম্বল গণনা ও গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। সেই কমিটি মোগলাবাজার থানার কম্পাউন্ডে তল্লাশি চালিয়ে দ্বিস্তরবিশিষ্ট ৫৬০ পিস দামি কম্বল পায়। কমিটি পরে আদালতকে অবহিত করে।

গত ৯ মার্চ আদালত তোবারক হোসেনকে সশরীরে হাজির হয়ে কৈফিয়ত দিতে বলেন। শুনানি চলাকালে তিনি জনৈক ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে জানান এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু আদালত তার অপেশাদার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা নামঞ্জুর করে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে এসএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি পাঠান। এসএমপি পরে তাকে কৈফিয়ত তলবনামা পাঠান এবং তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি, অপেশাদারিত্ব, অদক্ষতা, নৈতিক স্খলন, গাফিলতি অভিযোগ এনে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায়।

কিন্তু এসব ঘটনার নেপথ্যে যিনি প্রকৃত নায়ক, সেই ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, ‘কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছিল। সব কম্বল থানা হেফাজতে ছিল। পরে তা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।’

এসএমপি কমিশনারের একটি চিঠিতে বেশ কয়েকবার লেখা হয়েছে ওসির মদদে ও নির্দেশে কম্বল চুরি হয়েছে, কমিশনার কেন এটা লিখেছেন, এমন প্রশ্নে ওসি মনির বলেন, ‘কেউ কারও বিরুদ্ধে লিখলে তো আর কম লিখে না। তাই তিনি লিখেছেন।’

এ বিষয়ে এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, ‘আমি ওর (ওসি মনির) সঙ্গে কথা বলব। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে পুঙ্খানাপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রথমে বিভাগীয় ব্যবস্থা, পরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: কালবেলা

source: Asia Post

Back to top button