মার্কিন হামলায় বিরতি, আপাতত পালটা আঘাত বন্ধ রাখছে ইরানও

যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানের ওপর হামলা বন্ধ রাখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানও পালটা আঘাত চালাবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানান। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই দুই সপ্তাহ ধরে চলা অভিযান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আপাতত দুই পক্ষই পালটাপালটি হামলা থেকে বিরত রয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, টানা ১৩ রাত ধরে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর গত শুক্রবার গভীর রাতে পেন্টাগন হঠাৎ করেই অভিযানটি স্থগিত করে। এরপর শনিবার ও রোববার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাতের হামলার জবাবে ইরানও এতদিন প্রতিবেশী যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়ে আসছিল। তবে গত দুই দিন ধরে ইরানও কোনো নতুন হামলা চালায়নি।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ রোববার ফক্স নিউজকে বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য আরও সময় দিতেই ট্রাম্প সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ওয়াল্টজ বলেন, “তিনি আলোচনার জন্য কিছুটা সুযোগ করে দিচ্ছেন, আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছেন।” তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ইরানের অবস্থান এখনও ‘হামলার জবাবে হামলা’। হামলা বন্ধ হলে ইরানও তার সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে। এই বার্তা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে ইরানও ব্যাপক পালটা জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে।”
হামলা স্থগিতের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শনিবার বলেন, প্রেসিডেন্ট বরাবরই স্পষ্ট করে বলেছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরান যদি আন্তরিকভাবে আলোচনায় না আসে, তাহলে কী ঘটতে পারে, সেটিও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।
তবে ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে না।
তার ভাষায়, “এই হামলা বন্ধ হওয়ার ঘটনায় আশার চেয়ে সন্দেহই বেশি। তেহরানের ধারণা, এটি আন্তরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কৌশলগত বিরতি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণা নিয়ে ইরানের দীর্ঘ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।”
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মজুত নিয়ে উদ্বেগ
ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই ইরানে হামলা চালাচ্ছিল। অন্যদিকে ইরান বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য।
দুই সপ্তাহের এই মার্কিন সামরিক অভিযান কার্যত গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিকে ভেস্তে দিয়েছে। ওই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরু করা যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা যুদ্ধ আরও বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের অন্যতম আশঙ্কা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো রক্ষায় ব্যবহৃত হতে হতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে আসছে।
সিএনএন ও নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগনের চিফ অব স্টাফ ড্যান কেইন এসব উদ্বেগের বিষয়টি ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরেন। সিএনএন আরও জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও যুদ্ধ আরও বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এদিকে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন বিকেলে পেন্টাগন থেকে ইরানে হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হতো এবং তিনি প্রতি রাতেই তাতে অনুমোদন দিতেন। তবে শুক্রবার সর্বশেষ পরিকল্পনা তার সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি সেটিতে আর অনুমোদন দেননি।
উত্তেজনার নতুন মোড়
ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধ নতুন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতে বড় ধরনের লড়াই থেমে যাওয়ার পর এবং জুনে অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পর উভয় পক্ষই কতদূর পর্যন্ত উত্তেজনা বাড়ানো যায়, তা যাচাই করে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি সেতু ও সুড়ঙ্গে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নির্ভরশীল কয়েকটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেল পরিবহনে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে জ্বালানি পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। শনিবার হুতিরা কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
source: Rajneete






