ট্রাম্পের বলয়ের বাইরে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ছেন ভ্যান্স, নজর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও নীতিগত অগ্রাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
গত সেপ্টেম্বরে দলীয় সম্মেলনের পর ভ্যান্সের দেওয়া ছয়টি বক্তৃতা পর্যালোচনা করে তার রাজনৈতিক কৌশলে এ পরিবর্তনের চিত্র পেয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এর আগে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট উভয় কক্ষেই জয়লাভ করে কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময়ে বিরোধী দল-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হবেন।
রয়টার্স লিখেছে, নির্বাচনি প্রচারের শেষ পর্যায়ে দলটির পক্ষে ভোট টানতে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম ও জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো সামনে আনেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। সে সময় জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহিষ্কারের মতো ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থানগুলো এড়িয়ে যান ভ্যান্স।
ভ্যান্সের এই কৌশলের সঙ্গে পরিচিত দুজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এটি ছিল পরিকল্পিত পরিবর্তন। ভ্যান্স ও তার উপদেষ্টারা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি যেসব নীতির পক্ষে কথা বলে আসছেন, সেগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। নীতিগুলো ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের অংশ হলেও এখন সেগুলোর প্রধান প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেন ভ্যান্স।
ট্রাম্পের পর রিপাবলিকান রাজনীতির নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরুর মধ্যে ৪২ বছর বয়সী ভ্যান্সের নিজস্ব রাজনৈতিক পথ তৈরির বিষয়টিও সামনে আসছে। যদিও ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেননি তিনি। ট্রাম্পও এখন পর্যন্ত ভ্যান্স কিংবা অন্য কাউকে সমর্থন জানাননি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ভ্যান্সের নাম আলোচনায় রয়েছে।
রিপাবলিকান নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতে দলের নেতৃত্বে আসতে হলে ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর বড় অংশকে নিজের পাশে রাখতে হবে ভ্যান্সকে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় থেকেও নিজেকে আলাদা করতে হবে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের পরাজয়ের কারণ তুলে ধরে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন ভ্যান্স। রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, পররাষ্ট্রসম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে ডেমোক্র্যাটদের ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের তদবিরের পর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতিও সমর্থন জানান ট্রাম্প।
যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভ্যান্সের প্রকাশ্য অবস্থান
ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভ্যান্সের অবস্থান এবারই প্রথম এতটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে এল। তবে হোয়াইট হাউজ ও ভ্যান্সের যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ তৈরির উদ্দেশ্যে ওই পোস্ট দেননি ভাইস প্রেসিডেন্ট। পোস্টটি দেওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসও আগে থেকে জানতেন।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শুক্রবার হোয়াইট হাউজের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল করেন ট্রাম্প। সুসি ওয়াইলসকে সরিয়ে তার জায়গায় স্টিফেন মিলারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে ট্রাম্পের কঠোর নীতিগুলো আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ে এর প্রভাব ছিল বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা নেই তার। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি ভিন্ন কিছুই করতাম না।”
ভ্যান্সের ওই পোস্ট দেওয়ার আগে ট্রাম্প সেটি সম্পর্কে জানতেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। তবে ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কয়েকজন রক্ষণশীল রাজনৈতিক মিত্রও তার অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার জন বোহেনার এবং পল রায়ানের সাবেক উপদেষ্টা মাইকেল রিচির মতে, ভ্যান্সের এই অবস্থান ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে রক্ষণশীল রাজনীতির নেতৃত্বে তার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো করেছে।
ভাইস প্রেসিডেন্টের পদকে কাজে লাগাচ্ছেন ভ্যান্স
রিচি বলেন, ভ্যান্সের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রক্ষণশীলদের মধ্যে ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের কোন নীতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “এটাকে শুধু ট্রাম্পের থেকে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা হিসেবে দেখা খুবই সরলীকরণ হবে। বিতর্কের বিষয়বস্তু নির্ধারণে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন তিনি।”
এ বিষয়ে ভ্যান্সের প্রতিনিধিরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। হোয়াইট হাউজের প্রতিনিধিরা রয়টার্সকে বুধবারের বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেদিন সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভ্যান্সের দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বুঝতে পেরেছেন।
রয়টার্স লিখেছে, ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রার্থী যিনিই হোন, ডেমোক্র্যাটরা তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার চালাতে পারে। বিশেষ করে প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্প বড় ভূমিকা রাখলে এ পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ইগর ভলস্কি বলেন, “সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি এমন একটি প্রাথমিক দলীয় নির্বাচনেও জিততে হবে, যেখানে এখনো ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে। কীভাবে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।”
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ভ্যান্সের নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক হয়নি। যেসব রাজ্যে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানেও দলটির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। তার সমর্থন পাওয়া কয়েকটি নির্বাচনী কৌশলও দলের ক্ষতির কারণ হয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর একটি বিজ্ঞাপন ছিল। বিজ্ঞাপনটিতে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।
এদিকে, নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ নিয়ে মত দিয়েছেন ২০২৮ সালের সম্ভাব্য অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীরাও। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে দল যথেষ্ট কাজ করেনি। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের অভিযোগ, পরাজিত প্রার্থীরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিনগুলোতেও নিজের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন ভ্যান্স। বিভিন্ন সমাবেশে ভোটারদের রিপাবলিকানদের সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে জালিয়াতির তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। এসব বক্তব্যের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের অভিবাসননীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও যুক্ত করেন তিনি।
তবে প্রচারের সময় ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ প্রায় এড়িয়ে গেছেন ভ্যান্স। এমনকি ট্রাম্পের নামও খুব কম উল্লেখ করেছেন।
উত্তর ক্যারোলাইনায় নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিকের এক সমাবেশে ভ্যান্স বলেন, “আমি চাই, আমার সন্তানরা এমন একটি দেশে পরিবার গড়ে তুলুক, যে দেশ প্রাণবন্ত, সমৃদ্ধ, স্বাধীন ও সচ্ছল। আমি সাধারণ কিছু বিষয়ই চাই। আর আমি যেহেতু নিজের জন্য এসব চাই, তাই আপনাদের জন্যও তা চাই।”
source: Rajneete







