কে এই হাফেজ তাশরীফ, ধর্মীয় ইস্যু এলেই কেন হুমকি দেন তিনি

গাজীপুুর টঙ্গীর এক মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির শিশুকে ‘চুমু’ দিতে বলার অভিযোগে এক শিক্ষককে ওই শিশুর বাবার চড় দেওয়ার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ শিশুর বাবার পক্ষ নিয়ে ফেসবুকে সরব হয়েছেন। কেউ এভাবে ‘মারধর’ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন। এ ঘটনায় দৃশ্যত মাদ্রাসাশিক্ষকের পক্ষ নিতে দেখা গেছে আলোচিত বক্তা হাফেজ কারি জুবায়ের আহমাদ তাশরীফকে। এর আগেও তাকে ধর্মীয় বা মাদ্রাসাশিক্ষকদের নানা ইস্যুতে প্রতিপক্ষকে হুমকি দিতে দেখা গেছে।
টঙ্গীতে ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসাশিক্ষককে ‘চড়’ মারার ঘটনায় ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে ১৪ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডের লাইভ করেছেন জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। লাইভের ক্যাপশনে ‘টঙ্গী মাদ্রাসার শিক্ষককে কেন পেটানো হলো’ লেখে তিনি বলেন, শুধু ওই ঘটনার কারণে শিক্ষককে এভাবে পেটানো হয়নি। সেখানে বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে। কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বলাৎকার করলে তাকে কুত্তার মতো পেটানো উচিত। তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া দরকার। আমার মাদ্রাসায় এমন ঘটনা ঘটলে আমি পিটিয়ে জনগণকে পেটাতে বলব। মামলা করব। টঙ্গীর হুজুরকে ষড়যন্ত্র করে পেটানো হয়েছে। হুজুর তাকে ভালো কাজের জন্য চুমু দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। চুমু দিলে কি এভাবে পেটাবে?
থাপ্পড় দেওয়া যুবকের পোশাকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওর মতো রামছাগল দেশে দ্বিতীয়টা আছে? ওরে যেখানে পাওয়া যাবে, কুত্তার মতো পেটাইতে হবে। ঘটনা সত্য না হলে হুজুরকে যেভাবে পেটানো হয়েছে, তাকে ওভাবে পেটাতে হবে।
দেশের আলেমরা এখন কোথায় প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বড় বড় হুজুররা কেন এ ধরনের জালেম, স্বৈরাচারকে পেটাচ্ছে না? ওই লোক সাংবাদিকদের সামনে এসে অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। এরে যদি আমি দশবার হত্যা করি, তারপরও আমার হৃদয়ের রাগ মিটবে না।
এ ঘটনায় ২৩ অক্টোবর ওই পেইজে আবার লাইভে আসেন জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। তিনি জানান, পুলিশ অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করবে। হুজুর দোষী হলে বা এমন ঘটনায় দোষী প্রত্যেক হুজুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী কোনো হুজুরকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি।
তিনি ডাক দিলে টঙ্গীতে বড় ধরনের সমাবেশ হতো জানিয়ে বলেন, আলিয়া-কওমি এবং সুন্নি-ওয়াহাবি একসঙ্গে কাজ করতে হবে। হুজুরকে মারার ঘটনায় নাস্তিক্যবাদ এবং বিশেষ করে হিন্দুরা পর্যন্ত মারাত্মাক খুশি হয়েছে। তারা শাহজালাল রুমিকে বাহ্বা দিচ্ছে। সে এগুলো ফেসবুকে প্রচার করে প্রাউড ফিল করছে। তার থাপ্পড়টা ছিল অহংকারপূর্ণ ও বিদ্বেষপূর্ণ। সে এভাবে পিটিয়ে ফেসবুকে দিল কেন? সে ভাইরাল হওয়ার জন্য নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছে। দোষীদের বিচার করতে হবে। কে বডিবিল্ডার সেটা দেখা হবে না।
এক মাহফিলে দেওয়া বক্তব্য ২৪ অক্টোবর ওই পেইজে প্রকাশ করেন জুবায়ের আহমাদ তাশরিফ। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ছোট মেয়ে চুমু দেওয়া বা কোলে নেওয়া ছিল শিক্ষকের দোষ। বলছে, ধর্ষণ করে ফেলছে। থাপ্পড় মারা লোকটি সাংবাদিকদের বলছে, আলেমরা নাকি এরকমই হয়। তার মধ্যে আলেম বিদ্বেষ আছে। আলেমের গায়ে আঘাত করে সে আইনকে হাতে তুলে নিয়েছে।
টঙ্গী মাদ্রাসার ঘটনায় খতিব ফাউন্ডেশনের ব্যানারে গতকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে তাশরীফ বলেন, ‘আমি যদি বলি আমাদের অনেক বাচ্চাকে চুমু দিয়েছি, তাহলে আমাকে মারার সাহস ছিল। আমাকে মারার আগে তাকে শেষ করে ফেলত। আমার সঙ্গে হলে তাকে খতম করে দিত।’
অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত বলে জানান তাশরীফ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘একজনের অপরাধের কারণে মাদ্রাসা ভাঙচুর করা হবে কেন। এটা কি তার বাবার প্রতিষ্ঠান।’
ওই দিন ফেসবুকে আরেক পোস্টে তাশরিফ দাবি করনে, খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়া নাবালক (অপ্রাপ্তবয়স্ক) ছোট বাচ্চাকে চুমু দেওয়া ১০০ বার জায়েজ।
এর আগে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার ঘটনায় উল্লাস করে ফেসবুকে লাইভ করতে দেখা যায় জুবায়ের আহমাদ তাশরীফকে। সেখানে তিনি বলেন, ‘আপনারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। মানুষের হৃদয়ে আনন্দ দিয়েছেন। ময়মনসিংহের ঘটনা থেকে পুরো বাংলাদেশকে শিক্ষা নিতে হবে।’ পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছিলেন তাশরীফ।
এ ছাড়াও নানা ঘটনায় ফেসবুকে তাকে বিতর্কিত পোস্ট করতে দেখা গেছে। পোস্টে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়েও তিনি নীতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের বক্তব্য জানতে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজের মেসেঞ্জারে প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে বার্তা পাঠানো হয়। তিনি সাড়া দেননি।
তাশরীফের কর্মকাণ্ডে ইনকিলাব মঞ্চের জাবেরের ক্ষোভ
ধর্মীয় ইস্যুতে জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের এমন ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাদের মতে, এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটবে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের শনিবার (২৪ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে তাশরীফকে নিয়ে লিখেছেন, ‘জুবায়ের আহাম্মক তাশরীফ’ এই ভণ্ড যখন দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হয়, তখন উল্লাস করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রপোগান্ডা করেছিল। অথচ পুলিশের চার্জশিটে তার কোনো নাম আসেনি। পরবর্তীতে দ্রুত সময়ে সে তার ভিডিওটি ডিলিট করে দেয়। ইভেন নেত্রকোনায় যখন একটি বাচ্চা মেয়েকে রেপ করে মাদ্রাসার শিক্ষক। বিষয়টি যখন ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠানো হয়, সে সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে মেয়ের নানাকে এই ঘটনার রেপিস্ট হিসেবে সাজিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রপাগান্ডা করে। পরবর্তীতে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টে আসে যে, সেই মাদ্রাসার ছাত্রীকে সেই আটক করা মাদ্রাসার শিক্ষক রেপ করেছে। তখন ও এই ‘জুবায়ের আহাম্মক তাশরীফের’ বিরুদ্ধে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এখন সে ‘মাদ্রাসার ছোট বাচ্চাকে যৌন হয়রানির’ ঘটনায় সরাসরি ভিকটিমের পিতাকে হত্যার হুমকি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও প্রকাশ করেছে। অথচ এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো পদক্ষেপ নেই। সাধারণ জনগণ কি তাহলে ধরে নেবে রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই আবার এর মতো প্রপাগান্ডা ছড়ানো ভণ্ডদের পালছে না তো! সাধারণ জনগণ ও সচেতন জনগণ সরকারের কাছে এর জবাবদিহি চাওয়া উচিত।’
‘এই ছেলেকে থামান, প্লিজ’
সংগীতশিল্পী শেখ সোলায়মান ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে শনিবার তাশরীফের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘এই ছেলেকে থামান, প্লিজ। এই ছেলে চূড়ান্ত উগ্র। এর আগে দীপু চন্দ্র দাসকে যখন পুড়িয়ে মারা হয়, সে গর্ব নিয়ে উস্কানি ছড়িয়েছিল। পরবর্তীতে সমালোচনা হয়, সে ভুল স্বীকার করে। এখন টঙ্গীর ইস্যুতে সে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিচ্ছে। প্রকাশ্যে মবের হুমকি দিচ্ছে। প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাকে থামানো জরুরি। এই ছেলেটা প্রকাশ্য ১০ বার করে হত্যার হুমকি দিছে, সেই মেয়ের বাবাকে। তার উসকানিতে বড় ধরনের ঝামেলা হতে পারে। তাকে থামান কেউ।’
জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের পরিচয়
হাফেজ কারি জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের জন্ম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের সিটপাড়া গ্রামে। পড়াশোনার হাতেখড়ি শ্রীপুরের ফরিদপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসায়। ছেলেবেলা থেকেই কোরআন তেলাওয়াত ও ইসলামি সংগীত গাইতেন তিনি। বর্তমানে ওয়াজের মাঠে বেশ খ্যাতি রয়েছে তার।
আত-তাশরীফ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল তাশরীফ বর্তমানে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তুরাগের মুহাম্মাদিয়া জামে মসজিদে।
আল্লামা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বরমি ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ। তিনি ওই ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের চেয়ারম্যন পদপ্রার্থী। তাকে মামুনুল হকের ছবি সংবলিত পোস্টার সেঁটে প্রচারণা করতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বক্তব্য
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাশরীফের এ ধরনের বক্তব্য সমর্থন করে না। দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তাশরীফের বয়স কম। সংগঠনে সে নতুন যোগ দিয়েছে। সে একটি ইউনিয়নের দায়িত্বশীল, ইউনিয়ন থেকে নির্বাচন করবে। এগুলো তার ব্যক্তিগত ব্যক্তব্য। আমরা এ ধরনের বক্তব্য সমর্থন করি না।’
তাশরীফকে সতর্ক করতে সংশ্লিষ্ট শাখাকে বলা হয়েছে বলে জানান আতাউল্লাহ আমীন।
source: Asia Post







