ট্রাম্পের ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ভেঙে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা ইউক্রেনের, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাড়ছে দূরত্ব

রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে আবারও হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত রাশিয়া-ইউক্রেন ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ থেকে কিয়েভ সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রিয়াজান অঞ্চলের শোধনাগারটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ঘটনাটি ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও গভীর করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মস্কোর প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে রিয়াজান অঞ্চলে অবস্থিত তেল শোধনাগারে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন।
আঞ্চলিক গভর্নর পাভেল মালকভ জানান, হামলার পর শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও আগুন নিয়ন্ত্রণে জরুরি কর্মীরা কাজ করছেন।
ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা হামলাটি নিশ্চিত করে বলেন, রাশিয়া চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এর জবাব হিসেবে হামলা চালানো হয়েছে।
রিয়াজানের এই শোধনাগারটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি রোসনেফটের মালিকানাধীন। দেশটির মোট ৫ শতাংশ জ্বালানি এখানে পরিশোধন করা হয়। মস্কোকে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে হামলাটি শুধু সামরিক নয়, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও যুদ্ধ অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধৈর্যের সীমা শেষ: জেলেনস্কি
ট্রাম্প রোববার আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। এরপর ইউক্রেন রুশ তেল শোধনাগারে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। কিন্তু কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়া সেই বিরতি মানেনি। বরং কয়েক দিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে। রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত কিয়েভ নিয়েছিল, সেটি আর কার্যকর নেই। অর্থাৎ ইউক্রেন আবার এসব স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাবে।
জেলেনস্কির এ অবস্থান সরাসরি ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প বিশেষ করে রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার যুক্তি, এসব হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করছে এবং ডিজেলের দাম বাড়াচ্ছে।
কিন্তু কিয়েভের যুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউক্রেন মনে করছে, রাশিয়া যদি তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে পালটা আঘাতের সক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য কৌশলগতভাবে আত্মঘাতী হবে।
একই সময়ে ইউক্রেনে ৫ শতাধিক ড্রোন হামলা
জেলেনস্কির ক্ষোভের পেছনে চলতি সপ্তাহের রুশ হামলাগুলো বড় কারণ। সর্বশেষ হামলায় রাশিয়া ইউক্রেনে ৫০০টিরও বেশি ড্রোন ছুড়েছে বলে কিয়েভ জানিয়েছে। মধ্যাঞ্চলীয় কিরোভোহরাদ অঞ্চলে রাতের হামলায় তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। পোলতাভা অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি নাফতোগাজের একটি গ্যাস উত্তোলন স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
কিয়েভের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার হামলার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়েছে। এর আগের হামলায় রাজধানী কিয়েভের একাধিক বিদ্যুৎ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে ক্রেমলিন বলছে, রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টার বিরোধী। মস্কোর দাবি, তথাকথিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির সুনির্দিষ্ট পরিধিই এখনও পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হয়নি।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সবচেয়ে বড় ফাটল?
এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দ্রুত অবনতি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেন এখনো মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের বিরোধ শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি নেই, এর সরাসরি প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ইউক্রেন যদি রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করে, তবে বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়া উচিত। তার ভাষায়, এটিই হবে সম্পর্ক মেরামতের জন্য ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য শর্ত।
এরই মধ্যে কিয়েভ অভিযোগ করেছে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে যে সতর্কবার্তা সাধারণত পাওয়া যায়, সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলায় তা পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য গোয়েন্দা তথ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।
স্টারলিংক নিয়েও নতুন সংকট
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ড নিয়ে বিতর্ক। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ড্রোন পরিচালনা, যোগাযোগ ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন কাজে এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে।
১৪ অক্টোবর ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, চলন্ত অবস্থায় স্টারশিল্ড টার্মিনালের গতি ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটারে সীমিত করা হয়েছে। কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, এতে উচ্চগতির ড্রোনের কিছু মিশন ব্যাহত হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেন, এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপ থাকতে পারে।
মাস্ক অবশ্য বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বক্তব্য, স্টারশিল্ড সিস্টেম যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত; এর ব্যবহার বা গতিসীমা নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের হাতে।
পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ স্টারশিল্ডের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের খবর আসে ঠিক সেই সময়, যখন ইউক্রেন রুশ তেল স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রয়েছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পালটা কৌশল
ইউক্রেন গত কয়েক মাস ধরে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি স্থাপনা ও সামরিক লজিস্টিকসকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়া প্রায় পাঁচ বছর ধরে ইউক্রেনের শহর ও অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালিয়ে আসছে, রাশিয়ার ভূখণ্ডে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা তাদের সেই আক্রমণের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা।
এসব হামলার ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ ও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ট্রাম্পের স্বার্থের সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক কৌশলের সংঘাত তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প জ্বালানির দাম, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন; অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করতে তার জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত করতে চাইছে।
আরও একটি সামরিক দাবি
এদিকে ইউক্রেনের নৌবাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলের বোরিসোগ্লেবস্ক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ছয়টি এসইউ-৩৪এম যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে তারা। ইউক্রেনের দাবি, নেপচুন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ দাবির স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পাশাপাশি ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও নতুন এক সংকটের মুখে পড়েছে।
source: Rajneete







