ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত ৭৩১ সেনার দেহাবশেষ উদ্ধার, সম্পন্ন হলো শেষকৃত্য

ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিখোঁজ সেনাদের পরিচয় শনাক্তের বৃহৎ উদ্যোগের অংশ হিসেবে উদ্ধার করা ৭৩১ জনের দেহাবশেষের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এসব দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। বুধবার হো চি মিন সিটিতে আয়োজিত শেষকৃত্যে হাজারো মানুষ অংশ নিয়ে নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন বহনকারী বাসের শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপকণ্ঠের একটি সামরিক সমাধিক্ষেত্রের দিকে যায়। এ সময় সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাতে ছিল সাদা ফুল। অনেকে নীরবে প্রার্থনার মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করেন।
সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পৃথক ও গণকবর থেকে এসব দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের সংঘাতের সময় তাঁরা নিহত হন। হো চি মিন সিটির একটি গাছপালাঘেরা জনসাধারণের পার্কে কয়েক মাস ধরে খনন চালিয়ে এসব দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়।
নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে পরিবারগুলো
ওই পার্কের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক রয়েছে ৩৬ বছর বয়সী লে নগক মাই উয়েনের। তাঁর দাদি লে থি রিয়েং ছিলেন একজন বিপ্লবী যোদ্ধা। দাদির নামে নামকরণ করা পার্কটিতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন উয়েন। পরে তিনি জানতে পারেন, সেখানে তাঁর দাদির দেহাবশেষ সমাহিত থাকতে পারে।
সম্প্রতি পার্কের একটি স্মৃতিফলকের কাছে ধূপ জ্বালানোর পর উয়েন এএফপিকে বলেন, পার্কটিতে এলেই তাঁর মনে একধরনের পবিত্র অনুভূতি জাগে। খননকাজকে কঠিন বলে উল্লেখ করলেও দাদির দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
গত মার্চে শুরু হওয়া ৫০০ দিনের জাতীয় কর্মসূচির আওতায় এই অনুসন্ধান চলছে। যুদ্ধের পর থেকে নিখোঁজ থাকা কয়েক লাখ মানুষের সন্ধান এবং তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।
জুলাই থেকে কয়েক শ বিশেষজ্ঞ ও সেনাসদস্য পার্কটিতে খননকাজ করছেন। বুলডোজার, খননযন্ত্র ও পানির পাম্প ব্যবহার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাদামাটির ভেতর হাত দিয়ে দেহাবশেষ খুঁজতে হচ্ছে তাঁদের।
বুধবারের শেষকৃত্যে হো চি মিন সিটির উপমেয়র নগুয়েন মান কুয়ং বলেন, নিহত সহযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে তাঁরা কোনো সম্ভাব্য পদ্ধতি বা সুযোগ বাদ দেবেন না। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ সেনার নাম ও আদি নিবাস এখনো শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তিনি।
একজন সেনার পরিচয় শনাক্ত
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি স্কোয়াড লিডার হুয়িন ভ্যান কুয়েন। ১৯৬৮ সালে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই সেনার দেহাবশেষও লে থি রিয়েং পার্ক থেকে উদ্ধার করা হয়।
গত জুলাইয়ে তাঁর দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া নাম লেখা একটি কাগজের টুকরো এবং স্বজনদের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
ধারণা করা হয়, ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সংঘাতে প্রায় ১২ লাখ ভিয়েতনামি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এই যুদ্ধে প্রথমে ফ্রান্স এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জড়িয়ে পড়ে।
দেশজুড়ে পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি, এমন সেনাদের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কবর রয়েছে। এ ছাড়া দুর্গম বনাঞ্চল, কৃষিজমি এবং সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থানে আরও বহু সেনার দেহাবশেষ চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
ডিএনএ প্রযুক্তিতে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা
২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আরও ৭ হাজার সেনার দেহাবশেষ উদ্ধার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভিয়েতনাম সরকার। উপপ্রধানমন্ত্রী ফাম থি থান ট্রা এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি হৃদয়ের গভীর থেকে আসা এক তাগিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ভিয়েতনাম ছাড়াও প্রতিবেশী লাওস ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ সেনাদের সন্ধানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ কাজ করছেন। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে যুক্ত রয়েছেন আরও হাজারো কর্মী।
পরিচয় শনাক্তের লক্ষ্যে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার অশনাক্ত কবর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেহাবশেষের ১৮ হাজার নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং নিখোঁজ সেনাদের নিকটাত্মীয়দের জিনগত তথ্য নিয়ে একটি ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে।
প্রকল্পের পরিচালনা দলের সদস্য কর্নেল ত্রিন তুং লাম বলেন, কাজটি অত্যন্ত জটিল হলেও এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বর্তমান সময়ই সবচেয়ে উপযুক্ত।
গত সপ্তাহে হ্যানয়ের একটি ডিএনএ শনাক্তকরণ কেন্দ্রে পরীক্ষাগারের কর্মীদের ক্ষয়প্রাপ্ত হাড়ের টুকরো থেকে সতর্কতার সঙ্গে নমুনা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। কেন্দ্রটির পরিচালক ত্রান তুং থান এএফপিকে জানান, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেহাবশেষ পরীক্ষা করতে তাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান একটি বিশেষ প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে।
আন্তর্জাতিক কমিশন অন মিসিং পারসনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পাওয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। এতে ৫৮টি নমুনার মধ্যে ৫৪টি থেকে সফলভাবে জিনগত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় কাজটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেন থান।
সময়ের সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ
নিখোঁজ সেনাদের জীবিত স্বজনদের বয়স বাড়ছে এবং অনেকে মারা যাচ্ছেন। ফলে তাঁদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেহাবশেষের ক্ষয় অব্যাহত থাকায় সেখান থেকে ডিএনএ সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফেরার এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে ৬৮ বছর বয়সী দোয়ান ভ্যান কংয়ের পরিবারেরও। ১৯৫০ সালে নিহত তাঁর চাচার পরিণতি জানতে তাঁরা বছরের পর বছর বিভিন্ন সমাধিক্ষেত্রে ঘুরেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর চাচার বয়স ছিল বিশের কোঠায়।
পরিবারটির ধারণা, ফরাসি সেনাদের অতর্কিত হামলার পর তাঁর চাচাকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিল। সেখানে কমিউনিস্ট যোদ্ধাদেরও কবর দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের বিশ্বাস।
কং জানান, সন্দেহভাজন ওই স্থানগুলো খননের সুযোগ তাঁরা পাননি। এখন নিখোঁজ স্বজনের পরিণতি জানার জন্য সরকারের এই উদ্যোগকেই তিনি শেষ ভরসা হিসেবে দেখছেন।
ভিয়েতনামের এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু দেহাবশেষ উদ্ধার নয়, কয়েক দশক ধরে উত্তরহীন থাকা অসংখ্য পরিবারের অপেক্ষার অবসান ঘটানোরও চেষ্টা চলছে। তবে সময়ের সঙ্গে স্বজনদের হারিয়ে ফেলা এবং দেহাবশেষের ক্ষয় বাড়তে থাকায় নিখোঁজ সেনাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
source: Asia Post







