বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদ, ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি

আসন্ন বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ও আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচারের প্রতিবাদ এবং টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সংঘটিত হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিট প্রদানের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানিতে বাংলাদেশে দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিশ্ব ইজতেমার মতো বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করছে। এ জন্য তারা বর্তমান সরকার, সরকারপ্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের উত্তম প্রতিদান কামনা করেন।’
বক্তারা জানান, আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের বিষয়ে গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ী নেজামের অধীনে দুই ধাপে ইজতেমা আয়োজনের বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়েছে। নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী প্রথম ধাপ ৮-১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু গত ৯ অক্টোবর স্বনামধন্য পত্রিকা কালের কণ্ঠ অনলাইনে প্রচারিত একটি ভিডিও বার্তায় কথিত মুফতি ওসামা ইসলাম দাবি করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে ২০২৭ সালের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি টঙ্গীতে সাদপন্থিদের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে এবং ভারতের নিজামুদ্দিন থেকে মাওলানা সাদ কান্ধলভী তাতে অংশ নেবেন।
বক্তারা বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত ও সভার কার্যবিবরণী সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমন বক্তব্যের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কোনো আশ্বাস দিয়েছেন কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো বক্তব্য প্রচার করা হলে তার প্রকৃত অবস্থানও জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া উচিত।’
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থিদের কর্তৃক সংঘটিত সহিংসতার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তব্য ও নির্দেশনা পরিস্থিতিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছিল। তাদের দাবি, এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত পয়লা বৈশাখ ও পবিত্র শবে মেরাজের প্রসঙ্গসংবলিত একটি বক্তব্যের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। বক্তারা ওই বক্তব্যের ধর্মীয় তাৎপর্য ও যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানান।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মুফতি ওসামা ইসলাম ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান। এ বিষয়ে কোনো আইনগত অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা প্রচলিত আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা বলেন, ‘বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দ্বিনি পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ আয়োজন নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, উসকানি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা তারা চান না।’
তাই সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলন থেকে উত্থাপিত ৫ দফা দাবি
দ্রুত চার্জশিট প্রদান: ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থিদের কর্তৃক নৃশংস হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে আইন অনুযায়ী চার্জশিট দাখিল করতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা: বিশ্ব ইজতেমা ২০২৭-এর আয়োজন ও সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা প্রচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সাদপন্থী নেতা ওয়াসিফুল ইসলাম ও তার ছেলে ওসামা ইসলামের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
উসকানিমূলক প্রচারণা বন্ধ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য, সহিংসতার আহ্বান কিংবা সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিহতদের পরিবার ও আহতদের ন্যায়বিচার: ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনায় নিহতদের পরিবার এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তাবলিগের কার্যক্রমে সরকারি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা: প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি সমন্বিত রেখে অন্য কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, তাদের এসব দাবি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ থেকে উত্থাপিত নয়; বরং বিশ্ব ইজতেমার সুষ্ঠু আয়োজন, সরকারি সিদ্ধান্তের যথাযথ বাস্তবায়ন, ধর্মীয় পরিবেশের সুরক্ষা এবং অতীতের সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থেই এসব দাবি জানানো হয়েছে।
তারা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমা ২০২৭-এর আয়োজন নিয়ে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদানের অনুরোধ জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মুফতি কেফায়তুল্লাহ আজহারী। এ ছাড়া মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, মাওলানা লোকমান মাঝহারী, মাওলানা সালাউদ্দিন, মাওলানা আনিসুর রহমান, মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান উপস্থিত ছিলেন।
source: Asia Post







