দেশের সয়াবিন তেলে সিসা-নিকেল-কপার-আর্সেনিক

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে পাওয়া সয়াবিন তেলে ক্ষতিকর মৌলের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়।
ঢাকার চারটি পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২১টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ২০টি নমুনায় সিসার মাত্রা এবং সব নমুনায় আর্সেনিক ও তামার মাত্রা অনেক বেশি। এ ছাড়া ১৪টি নমুনায় নিকেলের মাত্রাও নির্ধারিত মানের বেশি পাওয়া গেছে।
গত ৮ অক্টোবর জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন।
গবেষণায় ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২১টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি ছিল ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তেল এবং ১৫টি ছিল খোলা তেল।
গবেষকেরা সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল ও তামা এই আটটি মৌলের উপস্থিতি ও মাত্রা বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, সয়াবিন তেলের একটি নমুনায় সিসার মাত্রা ভোজ্য তেলের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৯ গুণ ও নিকেলের মাত্রা প্রায় ২৪ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। পরীক্ষিত নমুনাগুলোতে সিসার পরিমাণ প্রতি কেজিতে ০.০৪৮ থেকে ১.৫২৯ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়।
আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.১৫৫ থেকে ০.২৭৬ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে, যা গবেষণায় তুলনার জন্য ব্যবহৃত এফএও-ডব্লিউএইচওর সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১.৫৫ থেকে ২.৭৬ গুণ বেশি। পরীক্ষিত ২১টি নমুনার সবগুলোতেই আর্সেনিকের মাত্রা ওই মান ছাড়িয়েছে।
নিকেলের মাত্রা প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ২.৩৬৮ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। যা সহনীয় মাত্রার ০.১ মিলিগ্রামের তুলনায় প্রায় ২৩.৬৮ গুণ বেশি। ২১টি নমুনার মধ্যে ১৪টিতে নিকেলের পরিমাণ ওই সীমা অতিক্রম করেছে।
এ ছাড়া, তামার মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.১০৭ থেকে ০.৮০৬ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে, যা সহনীয় মাত্রা ০.১ মিলিগ্রামের চেয়ে ১.০৭ থেকে ৮.০৬ গুণ বেশি। অর্থাৎ, সব নমুনাতেই তামার মাত্রা সহনীয় মানের চেয়ে বেশি ছিল।
তবে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ প্রতি কেজিতে ০.০০৪ থেকে ০.০২৬ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে, যা সহনীয় মাত্রা ০.০৫ মিলিগ্রামের নিচে।
গবেষণায় আটটি মৌলের মধ্যে ক্রোমিয়ামের গড় ঘনত্ব ছিল সর্বোচ্চ প্রতি কেজিতে ২.৩৫৮ মিলিগ্রাম। নমুনাভেদে এর মাত্রা ছিল ১.১১০ থেকে ৫.৬৪৩ মিলিগ্রাম। তবে ভোজ্য তেলে ক্রোমিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সীমা না থাকায় এই মাত্রাকে কোনো নির্ধারিত সীমা অতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
সয়াবিন তেলে এসব মৌল কীভাবে এসেছে, তা এই গবেষণায় নিশ্চিত করা যায়নি। গবেষকদের মতে, সয়াবিনের উৎপাদন, মাটি ও সেচের পানি, তেল পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, যন্ত্রপাতির সংস্পর্শ, সংরক্ষণ এবং প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে দূষণ ঘটতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা না করায় নির্দিষ্ট কোনো উৎসকে দায়ী করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, গবেষণায় নমুনা ছিল মাত্র ২১টি ও এগুলো ঢাকার চারটি পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। নমুনাগুলো সারা দেশের বাজারের প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই এই ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সব সয়াবিন তেলের মান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।
গবেষণায় প্যাকেটজাত ও খোলা তেলের মধ্যে দূষণের উৎস বা ঝুঁকির বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যও পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে উৎপাদনকারী, উৎপাদনের চালান, কাঁচামালের উৎস ও পরিশোধনপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য সব নমুনার ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
গবেষকেরা প্যাকেটজাত ও খোলা উভয় ধরনের সয়াবিন তেলের নিয়মিত পরীক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা বিধির কার্যকর প্রয়োগ এবং উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারের সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি ক্রোমিয়ামের বিভিন্ন ধরন আলাদাভাবে পরীক্ষা করে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে নিরূপণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
source: Asia Post






