ব্যক্তিগত শোক থেকে পুরাণের পুনর্নির্মাণ, নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের সাহিত্যযাত্রা

কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক অ্যান কারসন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার মতো মানবিক অনুভূতিকে প্রাচীন সাহিত্য ও রহস্যবাদের উপাদানের সঙ্গে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপনের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
স্টকহোম থেকে এএফপির খবরে বলা হয়, সুইডিশ একাডেমি বৃহস্পতিবার কারসনের নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। একাডেমির ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন প্রকাশভঙ্গি তৈরি করেছেন তিনি।
একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ জানান, পুরস্কার ঘোষণার পর কারসনের সঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত কথা হয়েছে। এ সময় কারসন আইসল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন এবং বাতাসের শব্দ শুনছিলেন। পুরস্কারের খবর শুনে তিনি বিস্মিত হলেও তাঁর কণ্ঠে আনন্দের স্পষ্ট প্রকাশ ছিল বলে জানান কার্লবার্গ।
প্রাচীন ভাষা, সাহিত্য, নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন কারসন ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক। ২০০১ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাকে অন্যতম সেরা প্যাস্টিশ রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। বিভিন্ন সাহিত্যিক ধারা ও রচনাশৈলীকে নতুনভাবে মিশিয়ে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণে তার দক্ষতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে তার স্বতন্ত্র কবিতা পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ সময় তিনি ১৯৯৬ সালে ল্যানান অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯৭ সালে পুশকার্ট প্রাইজসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স ব্যাপক প্রশংসা পায়। গ্রিক পুরাণের চরিত্র গেরিয়ন ও হেরাক্লিসের কাহিনিকে ভিত্তি করে রচিত বইটিতে সমকামী প্রেমের ত্রিভুজকে কেন্দ্র করে আধুনিক আখ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। পুরাণের পুরোনো কাঠামোকে সমকালীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে কারসন তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
সুইডিশ একাডেমি বলেছে, তার সাহিত্যকর্মে ভাষার প্রতি ভাষাতাত্ত্বিকের গভীর অনুরাগ এবং নতুন অর্থ অনুসন্ধানে কবির আকাঙ্ক্ষা একত্র হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তার নক্স কবিতাটির কথা। ২০০০ সালে মারা যাওয়া ভাইয়ের স্মৃতির উদ্দেশে রচিত এ দীর্ঘ কবিতাকে একাডেমি অসাধারণ সাহিত্যকীর্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।
কবিতাটিতে ব্যক্তিগত শোকের অনুভূতি ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়েছে। এর বিশেষত্ব শুধু সাহিত্যিক নির্মাণে নয়, উপস্থাপনার ধরনেও। দীর্ঘ কাগজে মুদ্রিত কবিতাটিতে ছবি, চিঠি ও অন্যান্য লিখিত উপাদান যুক্ত রয়েছে, যা একে স্মৃতির এক অনন্য শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।
সাহিত্যে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে নারীদের কম প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ১৯০১ সালে পুরস্কারটি চালুর পর থেকে মোট ১২২ জন বিজয়ীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১৯ জন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের আধিক্য নিয়েও সুইডিশ একাডেমি সমালোচিত হয়েছে।
২০১৮ সালে যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর একাডেমি বড় ধরনের সংকটে পড়ে। এর পর প্রতিষ্ঠানটির সদস্যপদ ও কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।
গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। তাঁর লেখায় উত্তরাধুনিক ডিস্টোপিয়া ও অস্থির সমাজবাস্তবতার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
শান্তিতে নোবেলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা
এ সপ্তাহে ঘোষিত ছয়টি নোবেল পুরস্কারের মধ্যে সাহিত্যের পুরস্কারটি ছিল চতুর্থ ঘোষণা। এর আগে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার অসলোতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। আগামী সোমবার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের পুরস্কার ঘোষণার কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এবং ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মিকোলা কুলেবা। দখলকৃত অঞ্চল থেকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার জন্য কুলেবা পরিচিত।
এ ছাড়া যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সুদানের স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ, পোপ লিও চতুর্দশ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নামও এ আলোচনায় রয়েছে।
প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে একটি সনদ, একটি স্বর্ণপদক ও ১২ লাখ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কার দেওয়া হয়। একাধিক ব্যক্তি কোনো বিভাগে পুরস্কার পেলে নির্ধারিত অর্থ তাঁদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করবেন অ্যান কারসন। দিনটি নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৯৬ সালের এই দিনে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
source: Asia Post







