News

চার জেলার স্বপ্ন তাঁত প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি নির্মাণের আট মাসেও হয়নি চালু

ভবন তৈরি হয়েছে, ভেতরে বসানো হয়েছে ডিজিটাল পাওয়ার লুম, আধুনিক তাঁত, এমব্রয়ডারি, চরকা ও সেলাই মেশিনসহ ২০ ধরনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। কিন্তু প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বগুড়ার কাহালুর বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।

বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধার তাঁতীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঁচতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ভবনটি তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে জনবল না থাকায় এখনো শুরু হয়নি স্থায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এতে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও ক্রেতাদের চাহিদামাফিক তাঁতবস্ত্র তৈরির দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ অঞ্চলের তাঁতীরা।

কাহালু উপজেলা সদরে আশির দশকে তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলের তাঁতীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। বেসিক সেন্টারের মাধ্যমে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় তাঁতী সমিতি গড়ে ওঠে। তাঁতীদের প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি অস্বচ্ছল তাঁতীদের ঋণ দেওয়ার কার্যক্রমও শুরু হয়। এর ফলে নব্বইয়ের দশকে এসব জেলায় তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। বাড়িতে তাঁত বসিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, চাদর, গামছাসহ বিভিন্ন ধরনের তাঁতবস্ত্র তৈরি করতেন তাঁতীরা। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার শাওলসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে তাঁতবস্ত্রের বড় বাজার। বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এসব বাজার থেকে পাইকারি দরে তাঁতবস্ত্র কিনে নিয়ে যেতেন নিজ নিজ এলাকায়।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। স্থানীয় তাঁতীদের ভাষ্য, এ অঞ্চলের তাঁতীরা মূলত ২০ থেকে ৩২ সাইজের মোটা সুতা দিয়ে তাঁতবস্ত্র তৈরিতে দক্ষ। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই তারা এত দিন তাঁত চালিয়েছেন। কিন্তু আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাবে চিকন সুতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে পারছেন না। এমন অবস্থায় বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধার তাঁতীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঁচতলা তাঁত প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়।

তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চার জেলার তাঁতীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের জন্য কাহালু বেসিক সেন্টারের পাশে পাঁচতলা প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির কাজ শেষ হওয়ার পর ৪ ফেব্রুয়ারি সীমানাপ্রাচীর ছাড়া পুরো পাঁচতলা ভবনটি তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ভবন হস্তান্তরের পর রংপুর প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষকেরা এসে দুই ব্যাচে ২০ জন করে মোট ৪০ জন তাঁতীকে সাত দিন করে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এরপর আর স্থায়ীভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়নি।

গত ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন, বোর্ডের সদস্য ড. মোহাম্মদ মুঞ্জুরুল ইসলাম এবং পরিচালক (প্রশাসন) উপসচিব কে এম আবুল কালাম কাহালু প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বেসিক সেন্টার পরিদর্শন করেন। তারা বিভিন্ন এলাকার তাঁতী সমিতির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন। তবে কেন্দ্রটিতে কবে জনবল দেওয়া হবে এবং কবে থেকে স্থায়ী কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।

স্থানীয় তাঁতীরা বলছেন, শুধু ভবন নির্মাণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই তাঁতশিল্পের সংকট কাটবে না। প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করাই এখন তাদের প্রধান দাবি। তাদের মতে, আধুনিক নকশা, চিকন সুতা ও নতুন প্রযুক্তিতে তাঁতবস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ পেলে হারানো বাজারের একটি অংশ আবারও ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গ্রামের তাঁতী হযরত আলী বলেন, তার বাড়িতে এখনো তাঁত রয়েছে। কিন্তু আগের মতো কাজ ও আয় না থাকায় তাঁত চালানো ছেড়ে অন্য কাজ করছেন তিনি। তার মতো অনেক তাঁতীই প্রশিক্ষণের অভাবে ক্রেতাদের চাহিদামতো পণ্য তৈরি করতে না পেরে পেশা বদল করেছেন।

কালাই ইউনিয়ন তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি বেলার হোসেন বলেন, একসময় এ অঞ্চলে তাঁতবস্ত্রের রমরমা বাজার ছিল। তাঁত চালিয়েই অনেক পরিবার ভালোভাবে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাবে বাজার হারিয়েছেন তাঁতীরা। কাহালুর প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে চালু হলে এ অঞ্চলের তাঁতশিল্প আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

কাহালু তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা তন্ময় কুমার বলেন, আমাদের বেসিক সেন্টারের কার্যক্রম চালু আছে। তবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য এখনো জনবল দেওয়া হয়নি। প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জনবল এলে সেখানে স্থায়ীভাবে তাঁতবস্ত্র তৈরি ও তাঁতীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে দুটি সেক্টর। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আরেকটি বেসিক সেন্টার। বেসিক সেন্টারে পাঁচজন কর্মরত থাকলেও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কোনো জনবল নেই। রংপুরের প্রশিক্ষক দিয়ে আমাদের এখানে দুই ব্যাচের ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থায়ী প্রশিক্ষক না থাকলে রংপুর থেকে প্রশিক্ষক এসে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

source: Asia Post

Back to top button