News

শিক্ষা সংকটে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, জরুরি বৈঠকে মন্ত্রিসভা

শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, দীর্ঘ ক্লাসের সময় এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ঘাটতির প্রতিবাদে ফ্রান্স জুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিস অঞ্চলে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এখন দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে রূপ নিয়েছে।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। মন্ত্রীদের সফর বাতিল করে প্যারিসে থাকার নির্দেশও দেন তিনি।

সরকারের ভাষ্য, বিক্ষোভের সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ও অভিভাবকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্যারিসের লিসে ভলতেয়ারের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
প্যারিসের লিসে ভলতেয়ারের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের হিসাবে, বৃহস্পতিবার দেশ জুড়ে উচ্চবিদ্যালয় ঘিরে প্রায় ৯০০টি বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটে। এতে ১৬০টির বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও প্রবেশপথ আটকে দেওয়া হয়। শুক্রবার প্রায় ৪০০টি উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ ছিল। আন্দোলন শুরুর পর দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ। আটক ব্যক্তিদের বড় অংশই কিশোর।

কেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা ও অর্থসংকটে ফরাসি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক স্কুলে একটি ক্লাসে ৩৫ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও ভবনে পানি পড়ছে, কোথাও শ্রেণিকক্ষ ও শৌচাগারের অবস্থা খারাপ। চলতি বছরের মে-জুনের তীব্র গরমেও অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষে তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থাও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে।

প্যারিসে ময়লার ঝুড়িতে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
প্যারিসে ময়লার ঝুড়িতে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

এর সঙ্গে নতুন করে ক্ষোভ বাড়িয়েছে ২০২৭ সালের বাজেট। সরকারের প্রস্তাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার কথা বলা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির তুলনায় এই বৃদ্ধি কম হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো বলছে, বাস্তবে শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতি আরও বাড়বে। শিক্ষক ইউনিয়নগুলো মঙ্গলবার ধর্মঘটেরও ডাক দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা শুধু বেশি অর্থ নয়, পড়াশোনার জন্য নিরাপদ ও কার্যকর পরিবেশ চায়। প্যারিসের এক শিক্ষার্থী দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, স্কুলে ৪০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকলেও পর্যাপ্ত চেয়ার নেই। ভবনের অবস্থা খারাপ এবং শিক্ষক সংকট রয়েছে।

বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা

শুরুতে শান্তিপূর্ণ স্কুল অবরোধ ও বিক্ষোভ হলেও বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্যারিস, মার্সেই, রেনে ও স্ট্রাসবুর্গে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও আবর্জনার স্তূপে আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও স্কুলে আগুন ধরানোর চেষ্টা হয়েছে। মার্সেইয়ের কাছে লা সিওতায় এক শিক্ষকের ওপর পেট্রল ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে।

শুক্রবার ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত
শুক্রবার ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আন্দোলনে ৬৫ জন শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলপ্রধান।

অন্যদিকে, পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেটজাতীয় অস্ত্রে আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে মোট চারটি তদন্ত চলছে।

রাজনৈতিক সংঘাতও বাড়ছে

ফরাসি সরকার আন্দোলনে কট্টর বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (এলএফআই) উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবারের সংকট বৈঠকে এ অভিযোগ তোলা হয়। তবে এলএফআই তা অস্বীকার করেছে। দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বলেছেন, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সমর্থন করছেন এবং পুলিশের সহিংসতা নিয়েই তাদের উদ্বেগ।

শুক্রবার প্যারিসের কাছে অবারভিলিয়েতে লিসে বের্তেলো উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে আগুন নেভাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
শুক্রবার প্যারিসের কাছে অবারভিলিয়েতে লিসে বের্তেলো উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে আগুন নেভাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

সরকার একদিকে সহিংসতা দমনের কথা বলছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো নিয়েও আলোচনায় যেতে চাইছে। এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তবে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ আগামী সপ্তাহেও স্কুল অবরোধ ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ফ্রান্সে শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

source: Rajneete

Back to top button