জ্বর না থাকলেও ডেঙ্গুর এই লক্ষণগুলো থাকতে পারে

ডেঙ্গু মানেই শুধু তীব্র জ্বর, এমন ধারণা অনেকেরই আছে। কিন্তু ডেঙ্গু হলে জ্বরের পাশাপাশি শরীরে আরও বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ খুব হালকা হতে পারে, এমনকি কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে শুধু জ্বর আছে কি না, তা দেখে ডেঙ্গু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সাধারণত ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে র্যাশের মতো সমস্যা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপদের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর সময় শরীরে অন্য কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা জরুরি।
মাথাব্যথা
ডেঙ্গুর অন্যতম সাধারণ উপসর্গ মাথাব্যথা। জ্বরের সঙ্গে মাথা ভার লাগা বা তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সঙ্গেও মাথাব্যথা দেখা যায় বলে অনেক সময় এই লক্ষণকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তবে মাথাব্যথার সঙ্গে চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বমি ভাব বা ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে ডেঙ্গুর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চোখের পেছনে ব্যথা
ডেঙ্গুর একটি পরিচিত লক্ষণ হলো চোখের পেছনে ব্যথা। চোখ নড়াচড়া করলে এই ব্যথা বেশি অনুভূত হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার সঙ্গে চোখের পেছনে চাপ বা ব্যথার মতো অনুভূতি হয়।
এই লক্ষণটি ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পেশি, হাড় ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
ডেঙ্গুর সময় শরীরজুড়ে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে পেশি, হাড় ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শরীর এতটাই ব্যথা করে যে দৈনন্দিন কাজ করতেও কষ্ট হয়।
এই ধরনের শরীরব্যথা ডেঙ্গুর পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি। তবে শুধু শরীরব্যথা থাকলেই ডেঙ্গু হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অন্য উপসর্গ এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন।
বমি বমি ভাব ও বমি
ডেঙ্গু হলে পেটের অস্বস্তি, বমি বমি ভাব এবং বমি হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ হালকা থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে বারবার বমি হতে পারে।
বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত তিনবার বমি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এটি গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ হতে পারে।
ত্বকে র্যাশ
ডেঙ্গুর আরেকটি লক্ষণ হলো ত্বকে র্যাশ বা লালচে দাগ দেখা দেওয়া। শরীরের বিভিন্ন অংশে এই ধরনের র্যাশ হতে পারে।
তবে ত্বকে র্যাশ বিভিন্ন সংক্রমণ ও অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। তাই শুধু র্যাশ দেখে ডেঙ্গু নিশ্চিত করা যায় না। এর সঙ্গে অন্য উপসর্গ আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হয়।
গলা বা ঘাড়ের গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শরীরের কিছু গ্রন্থি বা লিম্ফ নোড ফুলে যেতে পারে। ঘাড় বা শরীরের অন্য অংশে গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এটি ডেঙ্গুর সম্ভাব্য লক্ষণ হলেও এককভাবে এই উপসর্গ ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রচণ্ড ক্লান্তি
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পরও অনেকের কিছুদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, অনেক রোগী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন।
তবে অসুস্থতার সময় অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্লান্তি, অস্থিরতা বা বিরক্তি দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর এমন পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমন নয়
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়। অনেকেই মনে করেন, জ্বর চলে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ অনেক সময় জ্বর চলে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হতে পারে।
এই সময়ে পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণজনিত কালশিটে, দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে বা জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
নাক ও মাড়ি থেকে রক্তপাত
ডেঙ্গু গুরুতর পর্যায়ে গেলে নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত হতে পারে। এই লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কারণ গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীরের রক্তনালিতে সমস্যা তৈরি হয়ে রক্তপাত এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বমি বা পায়খানায় রক্ত
বমির সঙ্গে রক্ত আসা বা পায়খানায় রক্ত দেখা গুরুতর সতর্কতামূলক লক্ষণ। এমন পরিস্থিতিতে ঘরে বসে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ বা কালশিটে
গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়ে কালশিটের মতো দাগ দেখা দিতে পারে। শরীরে অস্বাভাবিকভাবে এমন দাগ দেখা দিলে বিশেষ করে জ্বরের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
শ্বাস নিতে কষ্ট বা দ্রুত শ্বাস
গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শ্বাস দ্রুত হওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত হতে পারে।
কখন ডেঙ্গু পরীক্ষা করবেন
ডেঙ্গুর লক্ষণ অনেক সময় অন্যান্য ভাইরাসজনিত অসুস্থতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে একজন ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) বলছে, ডেঙ্গু নিশ্চিত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডেঙ্গু বা অন্য কোনো একই ধরনের সংক্রমণের পরীক্ষা দিতে পারেন।
ডেঙ্গুর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ জ্বর হলেও রোগটি শুধু জ্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, ত্বকে র্যাশ এবং অতিরিক্ত ক্লান্তিও ডেঙ্গুর সঙ্গে দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বর কমে যাওয়ার পরও সতর্ক থাকা। পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, রক্তবমি, পায়খানায় রক্ত, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। গুরুতর ডেঙ্গু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জীবনঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: সিডিসি, মায়ো ক্লিনিক
source: Asia Post







