News

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই: ইরান

স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখনো মতবিরোধ রয়েছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা এবং সেটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনায় এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বুধবার (১২ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানি ওই কর্মকর্তার মন্তব্য সংকটের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে পৃথক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। এতে তেলের দামও বেড়েছে।

এর আগে জুনে হওয়া শান্তিচুক্তিতে সব পক্ষের ওপর ‘তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে চুক্তিটি দ্রুত ভেঙে পড়ে। গত ৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেন। এর এক সপ্তাহ পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তিটি ‘স্থগিত’ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর যে অঙ্গীকার ইরান করেছিল, তা তারা মানেনি। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনও নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা অবরোধ তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া।

ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, “মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার একটি হলো অন্তর্বর্তী চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা। এ বিষয়ে একেবারেই কোনো অগ্রগতি হয়নি।”

এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটনের কোনো সাড়া পায়নি রয়টার্স।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজারও মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। পালটা জবাবে ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।

পালটাপালটি বক্তব্যে উত্তেজনা বাড়ছে

জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগও ছিল। ওই সময়ের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় ছিল।

বুধবার তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অবশ্য নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের ওই কর্মকর্তা। প্রতিবেদনে পাকিস্তান সরকারের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ৬০ দিনের ওই সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছে।

ইরানি ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “সময় বাড়ানোর কোনো আলোচনা নেই। কারণ ইরানের দৃষ্টিতে এমন কোনো সময়সীমাই শুরু হয়নি, ফলে তা বাড়ানোরও প্রশ্ন নেই। অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে এবং কয়েক দিন পর চুক্তি থেকে সরে যায়।”

গত দুই দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র— দুই দেশই তাদের বক্তব্যে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই মঙ্গলবার বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

এর এক দিন আগে সোমবার ট্রাম্প নতুন করে দাবি করেন, গত ৫০ বছরের যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সংঘাত চলাকালে ট্রাম্প কখনো পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো বলেছেন, শান্তিচুক্তি খুব কাছাকাছি।

মঙ্গলবার ওহাইও সফর শেষে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ইরান ভালোই চলছে, একেবারেই ভালো চলছে।”

তিনি বলেন, “৫০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দেশ অন্যদের ওপর দাদাগিরি করেছে। আসলে ৫১ বছরও বলা যায়, যদি বিষয়টি এভাবে চিন্তা করেন… এখন তারা আর মধ্যপ্রাচ্যের সেই দাদাগিরি করা দেশ নয়।”

জাহাজে হামলা

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু জলপথ এবং উপসাগরে প্রবেশের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২৬ ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া পরস্পরবিরোধী সংকেতের কারণে বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।

মঙ্গলবার জাহাজে পৃথক হামলার ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে মঙ্গলবার ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলায় একটি ছোট কার্গো জাহাজের চার ক্রু সদস্য নিহত হন। যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুতিদের চালানো এটিই প্রথম প্রাণঘাতী হামলা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অচল করতে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করা বন্ধ করতে জাহাজটিকে বারবার সতর্ক করা হলেও তারা তা উপেক্ষা করে।

সামুদ্রিক সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, জাহাজটি পাকিস্তানের উপকূলের কাছে হামলার শিকার হয়। তখন এটি ওমান উপসাগরের দিকে যাচ্ছিল।

বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার মূল্য ৩৫ সেন্ট বা দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৯ দশমিক ২৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো ব্রেন্টের দাম বাড়ল।

source: Rajneete

Back to top button