News

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে যাচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। আজ শুক্রবার সৌদিতে চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র তিনটি প্রধান সুন্নি মুসলিম দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পালটা আঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলোও হামলার মুখে পড়ার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে চুক্তির আওতায় প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি কী হবে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক দুটি সূত্র জানায়, শুক্রবারই চুক্তিটি সই হওয়ার কথা। পরে এক তুর্কি কর্মকর্তাও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে আরেকটি আঞ্চলিক সূত্রের ভাষ্য, চুক্তিটি সই হলেও শুক্রবারই তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা, বিপ্লবী শিয়া রাষ্ট্র ইরানের ভূমিকা এবং ক্রমেই আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা ইসরায়েল— এসব বিষয় নিয়ে তিন দেশই উদ্বিগ্ন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নিরাপত্তা হুমকি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।

ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বৃহত্তম। উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ সৌদি আরবেই ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলো অবস্থিত। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারকও। অন্যদিকে পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে বৃহস্পতিবার জেদ্দায় পৌঁছান। পরে তারা মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে আসিম মুনিরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানও শুক্রবার জেদ্দার উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তারা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি আরব বারবার ইরান, ইয়েমেনে তেহরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের হামলার মুখে পড়েছে। এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।

প্রায় এক বছর ধরে চলা আলোচনার পর এই চুক্তি হতে যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে রয়টার্স। সে সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছিলেন, সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের পক্ষে আঙ্কারা।

এর আগে সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশের ওপর হামলাকে অন্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং প্রয়োজনে ‘সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা’ ব্যবহারের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বাস্তবে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়ানো এড়িয়ে চলেছে। এর পরিবর্তে তারা তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার পথ বেছে নিয়েছে।

এ বিষয়ে পাকিস্তানের সরকার বা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এই সফরের লক্ষ্য দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুসংহত করা। অন্যদিকে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন চুক্তি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার পর প্রায় তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জর্জরিত। এই সময়ে অঞ্চলটির প্রায় প্রতিটি দেশই সীমান্তপারের হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তবর্তী দেশ হলেও তুরস্ক ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সরাসরি হামলা এড়াতে পেরেছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এই সংঘাত প্রশমিত করতে দুই দেশই আগ্রহী।

অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য গত তিন বছরের সংঘাতের প্রভাব আরও গুরুতর হয়েছে। তিন দিক থেকে হামলার মুখে পড়ার পাশাপাশি দেশটির তেল রপ্তানি ও উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা সুরক্ষা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ইসলামের পবিত্রতম স্থান মক্কায় এই চুক্তি সই হওয়ার ফলে এর প্রতীকী গুরুত্বও অনেক বেড়ে যাবে। কারণ, এটি তিন দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই গড়ে উঠছে।

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তান যুদ্ধজাহাজ ও প্রশিক্ষণ বিমান বিনিময় করেছে। ২০২৩ সালে রিয়াদ তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার চুক্তি করে, যাকে আঙ্কারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি বলে উল্লেখ করে।

রয়টার্স মে মাসে জানায়, পাকিস্তান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগও নিয়েছে ইসলামাবাদ।

এ ছাড়া জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়াতে কুয়েতের সঙ্গে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে আলোচনাও শুরু করেছে পাকিস্তান। এ বিষয়ে চলতি বছরের জুলাই মাসেও পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল রয়টার্স।

source: Rajneete

Back to top button