News

হরমুজে প্রবেশকারী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে ইরান, প্রস্তাবিত চুক্তিতে বড় ছাড়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে যেতে পারে। বুধবার ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। বাস্তবায়ন হলে এটি হবে ইরানের প্রতি দেওয়া সবচেয়ে বড় ছাড়গুলোর একটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এ প্রস্তাব নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইরানকে দেওয়ার বিষয়ে তারা কখনোই সম্মত হবেন না।

হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে গেলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে তেহরানের পক্ষে বড় পরিবর্তন ঘটবে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের সব দেশের জাহাজ কোনো ধরনের ফি ছাড়াই অবাধে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারত।

এদিকে অঞ্চল জুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রণালিটির উত্তর অংশ ইরান এবং দক্ষিণ অংশ ওমানের নিয়ন্ত্রণে। ইরান জানিয়েছে, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার উভয় যাত্রাতেই জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে।

অন্যদিকে পাঁচটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে পালটা হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্রদের ঝুঁকির মুখে ফেলে সামরিক পদক্ষেপের মূল্য বাড়াতে চাইছে ইরান।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ‘ইরানের সতর্কবার্তা ছিল একেবারে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে পালটা হামলা করবে।’

ইরান ইতোমধ্যে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা বাণিজ্যিক জাহাজও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

ইরানের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ যুদ্ধে তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন।

এদিকে লাস ভেগাসে এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানই চান। তিনি বলেন, ‘আমি একটি চুক্তি করতে চাই, কারণ আমি মানুষকে হত্যা করতে চাই না। আমি মানুষকে হত্যা করতে চাই না। কিন্তু একটা সময় হয়তো আমাদের সেটা করতেই হবে।’

অমীমাংসিত ইস্যু

ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা আঞ্চলিক ও ইরানি সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ‘চুক্তি খুব শিগগিরই হচ্ছে’— এমন মন্তব্যের সঙ্গেও তারা একমত নন।

আঞ্চলিক একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ‘হরমুজে কোনো না কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ইরানকে দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত ছাড় ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে।’

অন্য একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলোর আলোচকরা চাইছেন, জাহাজ পরিদর্শনের দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর তত্ত্বাবধানে থাকুক এবং কোনো ফি থাকলেও তা বাধ্যতামূলক নয়, স্বেচ্ছাভিত্তিক হোক।

ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে চায়। ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নিয়ে আলোচনা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ফি আরোপের পক্ষপাতী নয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আলোচনার টেবিলে থাকা চুক্তির খসড়ায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাখা হয়েছে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা কী হবে, সেটিই এখন অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত বিষয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, ‘এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ প্রবেশ ও প্রস্থানের উভয় ক্ষেত্রেই ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করে চলাচল করবে।’

তিনি বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘মৌলিক সমঝোতা’র পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ‘চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে’ রয়েছে।

গারিবাবাদি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান এমন বার্তা পেয়েছে যে, জুনের মাঝামাঝি হওয়া সমঝোতা স্মারকের অধীনে সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’। তার ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য এটিই অন্যতম শর্ত। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি।

চাপের মুখে ট্রাম্প

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে’র মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হবে এবং দেশটির নেতৃত্ব কে দেবেন, সে সিদ্ধান্তেও তার ভূমিকা থাকবে। কিন্তু নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের বড় অংশ যুদ্ধের বিরোধিতা করায় এখন তিনি সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে চাপের মুখে রয়েছেন।

মাসের পর মাস সামরিক অভিযান, এমনকি জুলাইয়ে টানা দুই সপ্তাহের বিমান হামলাও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারেনি। জুলাই মাসে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে আসছে।

মঙ্গলবার সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাদের ‘প্রায় সব’ দূরপাল্লার নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। এতে ভবিষ্যতে বড় কোনো সংঘাত মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (অ্যাটাকমস) এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম)।

এদিকে ট্রাম্প নতুন করে ইরানের ওপর হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পর গত দুই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আজ বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ২৪ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৭ সেন্ট বা ০.৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৭৯.০৮ ডলারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৫৩ সেন্ট বা ০.৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৪.৬৯ ডলারে নেমে আসে।

source: Rajneete

Back to top button