বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় টানা ৫ বছর, ডাক পাননি জাবির শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে

২৪০টিরও বেশি গবেষণাপত্র, ১৪ হাজারের বেশি সাইটেশন এবং টানা পাঁচ বছর ধরে অ্যালপার-ডগার (AD) ও স্ট্যানফোর্ড-এলসেভিয়ারের বিশ্বসেরা ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পাওয়া সত্ত্বেও নিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা বোর্ডে বসার সুযোগ পাননি জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ও গবেষক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। স্নাতকের (অনার্স) সিজিপিএ-তে মাত্র ০.০৬ পয়েন্ট কম থাকায় প্রাথমিক বাছাইয়েই বাদ পড়েছেন তিনি।
গবেষক মামুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সার্কুলার অনুযায়ী, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদনের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর- উভয় পরীক্ষায় ৪.০০ স্কেলে ন্যূনতম ৩.৬০ সিজিপিএ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মামুন স্নাতকোত্তরে ৩.৭৬ পেলেও স্নাতকে পান ৩.৫৪, যা নির্ধারিত সিজিপিএর চেয়ে মাত্র ০.০৬ পয়েন্ট কম। রবিবার (২৬ জুলাই) বিভাগটির এই শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড বসে।
গবেষক মামুনের এই অভিজ্ঞতা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রচলিত মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক বাস্তবতার ব্যবধানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
স্কোপাসের (Scopus) তথ্যমতে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশনে ১৯৪টি গবেষণাপত্র নিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই গবেষক জাবির সেরা পাঁচ বিজ্ঞানীর একজন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম’-এ উচ্চতর গবেষণা করছেন। সেখানে সব কোর্সওয়ার্কে সর্বোচ্চ ‘Distinction’ পাওয়ার পাশাপাশি ‘স্টাফ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ চার শতাধিক প্রতিযোগীর মধ্যে ‘আউটস্ট্যান্ডিং পোস্টগ্রাজুয়েট রিসার্চার’ ক্যাটাগরিতে রানার্স-আপ হয়েছেন।
নিজের অনুভূতি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, সাইটেশন ও গ্লোবাল কোলাবোরেশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে অবদান রেখে আসছি। অথচ শুধু সিজিপিএ-র ০.০৬ পয়েন্ট কম থাকায় ইন্টারভিউতেই অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলাম না। হয়তো ১০টি পেপার কম লিখে কিছু শিট মুখস্থ করলেই এই রিকোয়ারমেন্ট পূরণ হয়ে যেত!
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সেরা ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পাওয়ার পর তৎকালীন প্রশাসন তাকে ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে গবেষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে গবেষক হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার প্রথম পছন্দ ছিল নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, কারণ জাবিকে আমি হৃদয়ে ধারণ করি। আমার বক্তব্য নিয়ম ভেঙে চাকরি দেওয়ার জন্য নয়। তবে প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে কেবল একটি নির্দিষ্ট সিজিপিএকে একমাত্র চূড়ান্ত মানদণ্ড ধরা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
পাবলিক হেলথ বিষয়ে শিক্ষকতার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ দিন ধরে তরুণদের গবেষণা শেখানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে জানিয়ে তিনি যোগ করেন, আজ বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন মেধা ও উচ্চ গবেষণা সামর্থ্য দেখে শিক্ষক-গবেষক আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করছে, তখন আমাদের দেশের নীতি কী হওয়া উচিত? গবেষণার মান, সাইটেশন, শিক্ষণ দক্ষতা ও বৈশ্বিক অবদান বিবেচনা না করে কেবল সিজিপিএ-র ছকে আটকে থাকলে তরুণ গবেষকদের ধরে রাখা কঠিন হবে।
তবে নিজের প্রিয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই জানিয়ে তিনি লেখেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলে আজকের মামুন হওয়া হতো না। আমার কথাগুলো কোনো বিরোধিতা নয়, বরং প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বমঞ্চে আরও এগিয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে বলা। ভবিষ্যতে উপযুক্ত সুযোগ এলে অবশ্যই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে সেবা দিতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সভাপতি ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রথমে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম, পরে জানতে পেরেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী মামুন ফলাফলের জন্য বাদ পড়েছে। এ নীতিমালায় অনেক সময় দেখা যায় একজন ভালো গবেষকও আটকে যায়। এটা কোনভাবেও উচিত নয়, পলিসিগতভাবে একটা পরিবর্তন আনা জরুরি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, বিষয়টি উপাচার্য স্যার সরাসরি দেখভাল করেন। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। এছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি আগে অবগত করলে হয়তো আলোচনা করা যেত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য,স্কোপাস (এলসেভিয়ার)-এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল বিশ্বসেরা ২ শতাংশ গবেষক তালিকা প্রকাশ করেন। প্রতিবছরই এ তালিকা পরিবর্তন হয়, তবে ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গবেষক মামুন এ তালিকায় রয়েছেন।
source: The Daily Campus






