চলনবিলে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, হুমকিতে মাটির উর্বরতা

বৃহত্তম চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে উৎপাদিত হয় ধান, সরিষা, ভুট্টা, পাটসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল। তবে ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে অতিমাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কীটনাশক প্রয়োগ করেও অনেক ক্ষেত্রে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষিপ্রধান চলনবিলের তাড়াশসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ধানসহ নানা ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে কৃষকদের রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় কিংবা ঘন ঘন বালাইনাশক প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করলে মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীব, পরিবেশের ভারসাম্য এবং কৃষির স্বাভাবিক উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি কীটনাশকের কার্যকারিতা কমে গেলে কৃষকদের আরও বেশি অর্থ ব্যয় করে তা প্রয়োগ করতে হয়।
তাড়াশ উপজেলার টারোটিয়া গ্রামের কৃষক রাজ্জাক বলেন, জমির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। গত বছর মাটির অবস্থা ঠিক রাখতে বিঘাপ্রতি দুই মণ সার দিয়েছি। এবার এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় মণ সার দেওয়া হয়েছে, সামনে আরও দিতে হবে। অতিমাত্রায় কীটনাশক না দিয়েও উপায় দেখছি না। মাজরা পোকার আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত তিনবার কীটনাশক দিয়েছি, আবারও দিতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
উপজেলার লাউতা গ্রামের কৃষক আশরাফুল বলেন, আগে একবার কীটনাশক দিলেই কাজ হতো, এখন তিনবার দিলেও অনেক ক্ষেত্রে পোকা দমন হচ্ছে না। মাজরা ও ফুতি পোকার আক্রমণ ঠেকাতে ওয়ানস্টপ, নিডসট, ভিরতাকোসহ বিভিন্ন বালাইনাশক প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষকের খরচ বাড়ছে। জমিতে আগের মতো সাপ, ব্যাঙ, পাখি ও অন্যান্য উপকারী প্রাণীও চোখে পড়ে না। কীটনাশকের ক্ষতির বিষয়টি জানার পরও ধান রক্ষার জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে। না দিলে ধান ঘরে তুলতে পারব না।
উত্তর শ্যামপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, দিন দিন সারের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে। একদিকে সারের সংকট, অন্যদিকে দাম বেশি। আবার কীটনাশক ব্যবহার না করলেও উপায় নেই। বর্তমানে ধানে বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। কীটনাশক না দিলে ধান ঘরে তুলতে পারব কি না, তা নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়।
কৃষিবিদ হযরত আলী বলেন, কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, ফসল পর্যায়ক্রমে চাষ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। চলনবিলের কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কৃষকদের সচেতনতার পাশাপাশি কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং নিরাপদ কৃষিচর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য, উপকারী জীবাণু ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিরাপদ ও সঠিক নিয়মে বালাইনাশক ব্যবহার করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) অনুসরণ, জৈব সার ব্যবহার, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক যেন না ব্যবহার করে। সেই সাথে ফসলের রোগবালাই সঠিকভাবে শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রায় বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
source: Asia Post







